Monday 13 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মশা মারার অভিযানে চসিক, চোখে পড়ছে না নগরবাসীর

স্টাফ করেসপন্টেন্ড
৮ জুলাই ২০২৩ ১০:২৮

চট্টগ্রাম ব্যুরো: বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুও। গ্রামের চেয়ে শহরের পরিস্থিতি তুলনামূলক খারাপ। পরিস্থিতি ‘আশঙ্কাজনক’ উল্লেখ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়রকে চিঠি দিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন। চসিক বলছে, তারা মশা মারতে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালাচ্ছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের মশা মারার কোনো তোড়জোড় দেখছেন না নগরবাসী।

গত জুনে দুই দফায় মশা মারার ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করে চসিক। ৪ জুন মেয়রের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কাউন্সিলর আফরোজা কালাম প্রথমদফা মশা মারার অভিযান শুরু করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ ছাড়া এ অভিযান নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। মশা মারার ওষুধ পাওয়ার পর ১৮ দিনের ব্যবধানে ২২ জুন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী আরেকদফা ১০০ দিনের ক্রাশ প্রোগ্রামের উদ্বোধন করেন।

বিজ্ঞাপন

চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের দাবি, প্রতিদিন ৪২ থেকে ৫০ জন স্প্রে–ম্যান ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মশা মারার ওষুধ ছিটাচ্ছেন। কিন্তু ১০০ দিনের কর্মসূচির ১৬ দিন পার হয়ে গেলেও অভিযানের তেমন অগ্রগতির তথ্য নেই তাদের কাছেও। বরং মশা মারতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের গাফিলতি পেয়েছে সিটি করপোরেশন। এজন্য ছয়টি ওয়ার্ডের নয় কর্মীকে শোকজও করেছে পরিচ্ছন্ন বিভাগ।

নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা তাদের ক্ষোভ তুলে ধরছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাদের অভিযোগ, চসিকের ক্রাশ প্রোগ্রাম শুধুই লোকদেখানো, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

নগরীর বন্দর থানার সিম্যান্স হোস্টেল এলাকার বাসিন্দা আফতাব নূর ইফতি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম কী বুঝি না। গত এক বছরে আমাদের এলাকায় মশা মারার কোনো লোক দেখিনি।’

পাহাড়তলীর দক্ষিণ কাট্টলি এলাকার বাসিন্দা রনি কান্তি দেব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাসা দক্ষিণ কাট্টলি ওয়ার্ডে। কর্মস্থল সরাইপাড়া ওয়ার্ডে। গত দুই মাসে এই দুই এলাকায় আমার যেখানে যাতায়াত আছে, সেখানে আমি কাউকে মশার ওষুধ স্প্রে করতে দেখিনি। দিলেও আমার চোখে পড়েনি। আমি তো এলাকায়ই থাকি।’

হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরি মোড় এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান আরিফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘রোজার সময় সর্বশেষ মশা মারার ওষুধ ছিটাতে দেখেছি। এরপর এলাকায় আর কেউ সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ ছিটাতে আসেনি। এর মধ্যে মশার উপদ্রব বেড়েছে। এমনকি এসময়ে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উৎপাত বেড়েছে আশংকাজনকভাবে। অনেক ভয়ে আছি।’

সদরঘাটের ইসলামিয়া কলেজ মোড় এলাকার বাসিন্দা বিপ্লব দাশ সারাবাংলাকে জানান, গত দুই-তিনমাসেও তারা নিজেদের এলাকায় মশা নিধনের কোনো কার্যক্রম দেখতে পাননি।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম মাহী সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরুর আগেই ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্যের ভিত্তিতে নগরীতে ৫৭টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্পটগুলো ছাড়াও এর আশপাশে ৮০০ মিটার এলাকাজুড়ে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।

এছাড়া জরিপের মাধ্যমে নগরীতে ৪৩৫টি এডিস মশার প্রজনন পয়েন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলোতে দ্রুত ওষুধ ছিটানোর কাজ শুরু হবে। সার্বিক কাজের জন্য তিন মাস সময় তারা নির্ধারণ করেছেন বলে জানিয়েছেন।

ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের ভিত্তিতে চিহ্নিত হটস্পটগুলোর মধ্যে আছে– আকবর শাহ হাউজিং, উত্তর কাট্টলী, কর্নেলহাট, বিশ্বকলোনি, বাদামতল, আলকরণ, কোতোয়ালী, মাদামবিবির হাট, সদরঘাট, পশ্চিম বাকলিয়া, পূর্ব বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ খুলশী, পশ্চিম খুলশী, দক্ষিণ আগ্রাবাদ, উত্তর আগ্রাবাদ, বন্দরটিলা, চান্দগাঁও আবাসিক, নাছিরাবাদ প্রপার্টিজ, মেহেদীবাগ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, এনায়েতবাজার, গোয়ালপাড়া, কালির হাট, পূর্ব মাদারবাড়ী, পলোগ্রাউন্ড মাঠ সংলগ্ন এলাকা, সরাইপাড়া কাজিরদিঘী, শাপলা আবাসিক এলাকা হালিশহর, ঈদগাহ মুন্সিপাড়া, নাজিরপুল–কলাবাগান ডবলমুরিং, কৈবল্যধাম হাউজিং সোসাইটি, বায়েজিদ এলাকা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, অক্সিজেন, সিটি গেইট এলাকা, ফৌজদারহাট, চট্টগ্রাম কলেজ সংলগ্ন এলাকা, কাঠগড় মাইজপাড়া, বহদ্দারহাট ফরিদের পাড়া খাল ও আশেপাশের এলাকা, খতিববাড়ি খাল, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, হিলভিউ আবাসিক এলাকা, হামজারবাগ কলোনি সংলগ্ন ফরেস্ট একাডেমি, সমবায় আবাসিক এলাকা, পাহাড়িকা আবাসিক এলাকা এবং পূর্ব ষোলশহরের আমিন শ্রমিক কলোনি।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ২৫টি, ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডে ১৫টি, ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডে ১৫টি, ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ডে ৫২টি, ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডে ২৯টি, ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডে ১৭টি, ৮ নম্বর শোলকবহর ওয়ার্ডে ৩০টি, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ১৩টি, ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে ৬টি, ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে ১৬টি, ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডে ১২টি, ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ৩টি, ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডে ৭টি, ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডে ৫টি, ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে ৯টি, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে ৭টি, ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে ১৩টি, ২০ নম্বর দেওয়ানবাজার ওয়ার্ডে ১২টি, ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডে ১৪টি, ২২ নম্বর এনায়েত বাজার ওয়ার্ডে ৭টি, ২৩ নম্বর উত্তর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে ৮টি, ২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে ২টি, ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডে ১২টি, ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডে ১০টি, ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে ১২টি, ২৯ নম্বর পশ্চিম মাদারবাড়ি ওয়ার্ডে ১৬টি, ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ি ওয়ার্ডে ৮টি, ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডে ৩টি, ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে ৫টি, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডে ৫টি, ৩৫ নম্বর বঙিরহাট ওয়ার্ডে ৫টি, ৩৭ নম্বর মুনিরনগর ওয়ার্ডে ৫টি, ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডে ১টি, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডে ১৪টি, ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ১৬টি এবং ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ৪টি এডিস মশার প্রজননস্থল রয়েছে।

তবে ৩ নম্বর পাঁচলাইশ ওয়ার্ড, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ড, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ড, ৩৪ নম্বর ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ড এবং ৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙা ওয়ার্ডে কোনো প্রজননস্থল নেই বলে জরিপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ জুন ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করলেও তখন মশা মারার ওষুধের সংকট ছিল, যা দূর হয়েছে ২০ জুন। এর আগে ১৫ হাজার লিটার পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসকারী এডাল্টিসাইড ও লিটার লার্ভিসাইডের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতি লিটার এডাল্টিসাইডের মূল্য ৭৩৫ টাকা। প্রতি লিটার লার্ভিসাইডের মূল্য ৩ হাজার ৮৮০ টাকা। এ কার্যাদেশের বিপরীতে জুনে ১৫ হাজার লিটার এডাল্টিসাইড ও ৮০০ লিটার লার্ভিসাইড সরবরাহ করা হয়। বাকি লার্ভিসাইড এ সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ করার কথা।

প্রতি ওয়ার্ড কার্যালয়ে ১০০ লিটার করে এডাল্টিসাইড ও ২ লিটার করে লার্ভিসাইড (সঙ্গে পরিমাণমতো পানি ও রাসায়নিক) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চসিকের প্রধান কার্যালয়ের শ্রমিকদের প্রতিদিন একটি ওয়ার্ডে অন্তত ৫ লিটার করে ওষুধ ছিটানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওয়ার্ডে বরাদ্দের পর ১০ হাজার ১০০ লিটার এডাল্টিসাইড ও ৬৫০ লিটারের মতো লার্ভিসাইড মজুদ আছে চসিকের কাছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, ৭৩টি ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এছাড়া ৫০টি নতুন কেনা ফগার মেশিনের মধ্যে ৩৮টি মজুদ আছে। এছাড়া ১৫০টির বেশি স্প্রে মেশিন সচল আছে। নতুন মজুদ আছে ২২টি, প্রশিক্ষিত স্প্রে–ম্যান ১৭৫ জন।

মশক নিধন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম মাহী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি এখানে জয়েন করেছি তিন-চার মাস আগে। আগে এই শাখা নামে থাকলেও কাজ হতো না, এখন হচ্ছে। সামনে আরও জোরালো হবে। ক্রাশ প্রোগ্রামে ৪৪ জনের যে একটি বিশেষ টিম ছিল, সেটা ১০০ জনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ চসিকের কাছে মজুদ আছে।’

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘আশংকাজনক’

চট্টগ্রামে গতবারের চেয়ে এবারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘আশংকাজনক’ উল্লেখ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. ইলিয়াছ চৌধুরী।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্ষা মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই রেকর্ড ১৯৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭০৫ জন। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৭৫ জন।

বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ১৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৪৫জন।

সিভিল সার্জন ডা. মো. ইলিয়াছ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ২২ জুন থেকে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আশংকাজনকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত একদিনও আমরা ডেঙ্গুমুক্ত ছিলাম না। জুলাই মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ২০৫ জন।’

তিনি বলেন, ‘এ বছরেই ১২ জনকে হারিয়েছি, যার মধ্যে অর্ধেক শিশু। ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে খারাপ হবে, সেটা আমরা সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনকে এর আগেও সতর্ক করেছি।’

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে চট্টগ্রামে ২৭১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, মারা যান ৫ জন। ২০২২ সালে রেকর্ড ৪ হাজার ৪৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়, মারা যান ৪১ জন।

সারাবাংলা/আইসি/আরডি