Friday 10 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চবি ছাত্রীকে নিপীড়নে জড়িত সবাই ‘ছাত্রলীগের’

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৩ জুলাই ২০২২ ১৩:৩০

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের পর আপত্তিকর ভিডিও ধারণের ঘটনায় জড়িত ছয়জনকে শনাক্ত করেছে র‌্যাব। এদের মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি দুইজনকেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

শনাক্ত ছয়জনের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। র‌্যাব জানিয়েছে, ঘটনার নেতৃত্বদাতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. আজিম (২৩) চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আজিমের সঙ্গে গ্রেফতার বাকি তিনজন ছাত্রলীগের অন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। তারা সবাই ক্যাম্পাসেই বসবাস করেন।

বিজ্ঞাপন

তবে গ্রেফতার চারজন নিজেদের ছাত্রলীগের সমর্থক দাবি করেছেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ। আজিমের সঙ্গে গ্রেফতার বাকি তিনজন হলেন- নুর হোসেন শাওন (২২), নুরুল আবছার বাবু (২২) ও মাসুদ রানা (২২)।

আজিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ও নুরুল আবছার বাবু নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। নুর হোসেন শাওন হাটহাজারী কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান প্রথম বর্ষ ও মাসুদ একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

আজিমের বাবা আমির হোসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের স্টাফ কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। বাকি তিনজনের বাবাও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মচারী এবং ক্যাম্পাসে পরিবার নিয়ে থাকেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ।

একই ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত মেহেদী হাসান হৃদয়কে (২৩) র‌্যাব হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে তাকে এখনও গ্রেফতার দেখানো হয়নি।

র‌্যাব কর্মকর্তা ইউসুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার সময় মূলত যে ছয়জন জড়িত ছিল তাদের সবাইকে আমরা শনাক্ত করেছি। চারজনকে গ্রেফতার করেছি। সাইফুল নামে আরও দু’জনকে আমরা শনাক্ত করেছি। মেহেদীকে ভিকটিমের তথ্যমতে আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এনেছি। তবে ভিকটিম আজ (শনিবার) সকালে আমাদের জানিয়েছেন, একজন সাইফুল ও মেহেদীর চেহারার মধ্যে কিছুটা মিল আছে। সেজন্য ঘটনাস্থলে ওই সাইফুল ছিলেন নাকি মেহেদী ছিলেন সেটা তিনি নিশ্চিত হতে পারছেন না। তবে ঘটনার পর মেহেদীর মোবাইল থেকে তিনি ছাত্রলীগ সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আমরা সাইফুল নামীয় দুজনকে আটকের চেষ্টা করছি। আটকের পর বিষয়টি পরিস্কার হবে।’

পাঁচজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব জানায়, ঘটনার শিকার ছাত্রী গত ১৭ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে তার বন্ধুকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা হয়ে প্রীতিলতা হল সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাত সোয়া ১০টার দিকে দু’টি মোটর সাইকেলে আসা পাঁচজন তাদের পথরোধ করে জেরা করতে থাকে। ওই ছাত্রীর বন্ধুকে অহেতুক মারধর করতে থাকে। ভুক্তভোগী বাধা দিলে তাকেও মারধর করা হয়। এসময় ছাত্রী ও তার বন্ধুর সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে ছাত্রীর ব্যাগ ও দু’জনের মোবাইল কেড়ে নেয়। এছাড়া তাদের কাছ থেকে ১৩ হাজার ৭০০ টাকা কেড়ে নেয়া হয়।

এরপর দু’জনকে টেনেহিঁচড়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা হলের পেছনে ইটের রাস্তা দিয়ে ঝোপের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগে কোন সেশনে পড়ালেখা করেন- সেটা জানতে চেয়ে আবারও মারধর করে। একপর্যায়ে বন্ধুকে আটকে রেখে ওই ছাত্রীকে যৌন নীপিড়নের পর বিবস্ত্র করে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আজিম হচ্ছে ঘটনার মূল নেতৃত্বদাতা। সে নিজে তার মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেছে। গ্রেফতার বাবু ও শাওন ভিকটিম ও তার বন্ধুর দুটি মোবাইল কেড়ে নিয়ে একইসময় ভিডিও ধারণ করেছে। ভিডিও ধারণের পর আজিম হুমকি দেয় যে, তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক না করলে ভিডিও ভাইরাল করে দেবে। ছাত্রী ও তার বন্ধু প্রায় এক ঘন্টা ধরে নির্যাতনকারীদের হাতে জিম্মি ছিল। আমরা মোবাইল তিনটি উদ্ধার করেছি। ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় বা অন্য কোথাও শেয়ার হয়েছে কি না সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

যে দুটি মোটর সাইকেলে করে নিপীড়করা ঘটনাস্থলে এসেছিলেন এর একটি শাওনের এবং অন্যটি সাইফুলের। দুটি মোটর সাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শাওনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-৭ এর হাটহাজারি ক্যাম্প কমান্ডার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান।

চারজনকে গ্রেফতারের বর্ণনা দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা মাহফুজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পর আজিম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে রাউজানে তার ফুপুর বাসায় চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের নেতৃত্বে যে তদন্ত কমিটি হয়েছে তারা প্রথমে ঘটনার নেতৃত্বদাতা হিসেবে আজিমকে শনাক্ত করে এবং বিষয়টি আমাদের জানায়। তখন আমরা আজিমের অবস্থান শনাক্ত করে গত (শুক্রবার) রাতে তাকে রাউজান থেকে গ্রেফতার করি। মূলত তাকে গ্রেফতারের পরই ঘটনায় জড়িত সবার নাম আমরা পাই। এরপর শাওনকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাসা থেকে মোটর সাইকেলসহ গ্রেফতার করি। মাসুদ ও বাবুকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা থেকে গ্রেফতার করি।’

ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আজিমের বাসার ২৫০ থেকে ৩০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে ঘটেছে বলে জানান মাহফুজুর রহমান।

ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়নি এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন র‌্যাব কর্মকর্তা এম এ ইউসুফ। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতারা ঘটনায় জড়িতদের ধরতে সহযোগিতা করেছেন বলে দাবি তার।

এক প্রশ্নের জবাবে ইউসুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘গ্রেফতার চারজন জানিয়েছে- তারা ছাত্রলীগের সমর্থক। তাদের কোনো পদপদবী নেই। আজিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতির গ্রুপের সঙ্গে থাকে। বাকি তিনজন অন্য গ্রুপের। তারা শুধুমাত্র সমর্থক, নেতা বা কর্মী পর্যায়ের কেউ নন। তবে বাবার চাকরিসূত্রে তাদের সবার বাসা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এর ফলে তারা দাপট নিয়ে চলাফেরা করে। নিয়মিত ক্যাম্পাসের বিভিন্নস্থানে বসে আড্ডা দেয়। অপরিচিত কাউকে দেখলে পথরোধ করে জেরা করে। বিভিন্নসময় নানাজনকে নানাভাবে হেনস্থার অভিযোগ পাওয়া গেছে।’

উল্লেখ্য, নিপীড়নের ঘটনার পরদিন ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কার্যালয়ে অভিযোগ জমা দিতে গেলে চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল তাকে বাধা দেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পরদিন ১৯ জুলাই ছাত্রলীগের কেন্দ্র থেকে রুবেলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। তবে নোটিশে কারণ উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিপীড়নের ঘটনায় রুবেল ও তার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাকে এই শোকজ নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশ পাবার পরদিন তিনি ঢাকায় চলে যান।

ছাত্রী লাঞ্ছনার সঙ্গে চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের ‘সম্পৃক্ততার’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব কর্মকর্তা ইউসুফ বলেন, ‘আমরা এমন কোনো বিষয় পাইনি। ঘটনাটি একদম তাৎক্ষণিক ঘটেছে। পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। ওই ছাত্রীকে তারা কেউ চিনত না। সুতরাং তাদের টার্গেট ছিল না। আর ছাত্রলীগের সভাপতি বরং আমাদের সহযোগিতা করেছেন। ছাত্রলীগও চেয়েছে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তারা গ্রেফতার হোক।’

রেজাউল হক রুবেল শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক সংগঠন চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ার (সিএফসি) গ্রুপ নামে একটি উপদলের নেতৃত্ব দেন।

২০১৯ সালের ১৩ জুলাই রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি ও ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় এই দু’জনকে দিয়েই গত আড়াই বছর ধরে চলছে চবি ছাত্রলীগের কার্যক্রম। এদের মধ্যে রুবেল শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং টিপু চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

সারাবাংলা/আরডি/এএম