Sunday 05 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পরিচয়ে প্রতারক ডা. ইশরাত র‌্যাবের জালে ধরা

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১ আগস্ট ২০২১ ২১:১২ | আপডেট: ২ আগস্ট ২০২১ ০৩:৪১

ঢাকা: মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা করেছেন। চিকিৎসক হিসেবেই নামযশ কামাতে পারতেন। কিন্তু তা না করে নাম লিখিয়েছেন প্রতারক হিসেবে। বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে উপস্থাপন করতেন বিভিন্ন পরিচয়ে। কখনো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক, কখনো বিশিষ্ট আলোচক ও কূটনীতিক, কখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক— জায়গা বুঝে এমন নানা ভুয়া পরিচয় দিয়ে বেড়াতেন।

শেষ পর্যন্ত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) হাতে ধরা পড়েছেন এই ‘আন্তর্জাতিক প্রতারক’ ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা। রাজধানীর মিরপুর-১ থেকে তার সহযোগী মো. শহিদুল ইসলামকেও গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

রোববার (১ আগস্ট) বিকেলে কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খোন্দকার আল মইন এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, গ্রেফতারের সময় ঈশিতার কাছ থেকে ভুয়া আইডি কার্ড, ভুয়া ভিজিটিং কার্ড, ভুয়া সিল, ভুয়া সার্টিফিকেট, প্রত্যয়নপত্র, পাসপোর্ট, ল্যাপটপ ছাড়াও ইয়াবা ও বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দু’জন প্রতারণায় জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৩ সালে (সেশন ২০০৫-২০০৬) এমবিবিএস কোর্স শেষ করেন। ২০১৪ সালের জুনের শুরুতে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৪ সালের শেষের দিকে একটি সরকারি সংস্থায় চিকিৎসক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। চার মাস চাকরির পর শৃঙ্খলাজনিত কারণে চাকুরিচ্যুতও হন।

র‌্যাব জানিয়েছে, ভুয়া পরিচয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া নথিপত্র তৈরি করেছেন ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা। জায়গা অনুযায়ী পরিচয়ের সপক্ষে এসব ভুয়া নথিপত্র দেখাতেন। চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি তৈরি করেছেন এমপিএইচ, এমডি, ডিও ইত্যাদি ডিগ্রির ভুয়ার সনদ। আবার চিকিৎসা বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইটে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, আর্টিকেল বা থিসিস পেপারও প্রকাশনা করেছেন। র‌্যাবের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত অনলাইনে পাওয়া বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রকাশনা সম্পাদনা করে তিনি নিজের নামে চালিয়ে দিতেন।

গ্রেফতার ইশরাত রফিক ঈশিতা জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানিয়েছেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিদেশ থেকে প্রচুর পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন বলে প্রচার করতেন তিনি। এর মধ্যে ২০২০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে হোটেল পার্ক অ্যাসেন্টে অনুষ্ঠিত জিআইএসআর ফাউন্ডেশনের দেওয়া ইন্টারন্যাশনাল ইন্সপিরেশনাল উইমেন অ্যাওয়ার্ড (আইআইডব্লিউ ২০২০), সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘রিসার্চ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ভারতের ‘টেস্ট জেম অ্যাওয়ার্ড ২০২০’; থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে অংশ নিয়ে ‘আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড’— এরকম নানা পুরস্কার পাওয়ার তথ্য প্রচার করেছেন ডা. ঈশিতা, যার কোনোটিই আদতে তিনি পাননি। শুধু তাই নয়, প্রতারণার মাধ্যমে ভুয়া নথি ব্যবহার করে ২০১৮ সালে জার্মানিতে ‘লিন্ডে ও নোবেল লরিয়েট মিটে (মেডিসিন)’ অংশও নেন তিনি।

র‌্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতার ডা. ইশরাত ঈশিতা করোনা মহামারিকে পুঁজি করে ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণায় সক্রিয় ছিলেন। এ বিষয়ে আলোচক ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তিনি। অনলাইনে করোনা প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন ও সার্টিফিকেট বিতরণের প্রচার-প্রচারণা চারিয়েছেন। একইসঙ্গে অনিবন্ধিত ও অননুমোদিত বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমতো আন্তর্জাতিক প্রতারণামূলক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রতারণা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জড়িতরা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের ভুয়া অ্যাওয়ার্ড দিতেন। এরই মধ্যে বুরুন্ডি ও আফগানিস্তানে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

ইশরাত রফিক ঈশিতা প্রতারণার কৌশল হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর র‌্যাংক ব্যাজ ও পদ অর্জনের চেষ্টা চালান। তিনি ফিলিপাইনে পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট থেকে ৪০০ ডলারের বিনিময়ে সামরিক বাহিনীর ‘বিগ্রেডিয়ার জেনারেল’ পদটি অর্জন করেন বলে জানায় র‍্যাব। এছাড়াও তিনি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন, কাউন্টার ক্রাইম ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন ইত্যাদি সদস্য পদের ভুয়া সনদ তৈরি করেও প্রচারণা চালাতেন।

র‌্যাব জানায়, বিভিন্ন স্থানে পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা এড়াতে ইশরাতকে ‘বস’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম দিদার। তিনি টেলিফোনে, অনলাইনে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ইশরাতের পরিচয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করতেন।

গ্রেফতারকৃত মো. শহীদুল ইসলাম দিদার ২০১২ সালে একটি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা (ইঞ্জিনিয়ার) সম্পন্ন করেন। পরে তিনি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমাও সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি একটি পোশাক কারখানায় কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। তিনিও ফিলিপাইনে একই ওয়েবসাইট থেকে অর্থের বিনিময়ে মেজর জেনারেল পদ ধারণ করেছেন। নিজেকে আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক), ইয়াং ওয়ার্ল্ড লিডার ফর হিউম্যানিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের ফাউন্ডার (প্রতিষ্ঠাতা) বা কর্ণধার হিসেবে উপস্থাপন করেন। একইভাবে তিনি দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার দূত বা অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন।

ব্রিফিংয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, প্রতারক গ্রুপের বেশ কয়েকজন সহযোগী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর