চট্টগ্রাম ব্যুরো: সেবা ছাউনি আর দেয়াল জুড়ে চিত্রকর্মের মাধ্যমে নান্দনিক আবহ সৃষ্টি করে নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করেছে চট্টগ্রামের প্রায় শতবর্ষী কোতোয়ালী থানা। নবযাত্রার উদ্বোধনীতে থানা প্রাঙ্গন জুড়ে বসেছিল উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধিসহ সুধীজনদের মিলনমেলা।
সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান চট্টগ্রাম নগরীর প্রতিটি থানায় কোতোয়ালী থানার মতো সেবাধর্মী পরিবেশ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন।

সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে নগরীর কোতোয়ালী থানায় সেবা ছাউনির উদ্বোধন করেন সিএমপি কমিশনার। প্রথমবারের মতো দেশের কোনো থানায় এ ধরনের সেবা ছাউনি তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন। এছাড়া থানা থেকে উর্দ্ধতন পর্যায়ে ‘দৈনিক অপরাধ প্রতিবেদন’ পাঠানোর জন্য একটি ডিজিটাল অ্যাপসেরও উদ্বোধন করা হয়েছে।
বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, বৃটিশ আমলে ১৯২২ সালে চট্টগ্রামে কোতোয়ালী থানার যাত্রা শুরু হয়। প্রচলিত রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ৯৮ বছর বয়সী এই থানা ভবনকে ভিন্নরূপ দিয়েছেন ওসি মোহাম্মদ মহসীন। যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন আশপাশের এলাকার সাধারণ লোকজনও। থানা প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয়েছে যাত্রী ছাউনি, যেখানে থানায় বিভিন্ন প্রয়োজনে আসা লোকজন বসতে পারবেন এবং প্রাথমিক সেবা পাবেন। পুরনো ভবনের বিভিন্নস্থানে সংস্কার করা হয়েছে। থানার চারপাশ পরিচ্ছন্ন করে বাগান করা হয়েছে।

থানার ভেতর ও বাইরে দেওয়ালে লাগানো হয়েছে ৫৯টি শিল্পকর্ম। মনীষীদের বিভিন্ন উক্তি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে এই শিল্পকর্মে। এছাড়াও আছে জঙ্গিবাদ, মাদক, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেওয়াল লিখন।
উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ‘কোতোয়ালী থানায় এসে পুলিশকে নিয়ে মানুষের আশা করার মতো একটা বাস্তব ভিত্তি পাচ্ছি। সবসময় বলা হয় যে, পুলিশ মানুষের বন্ধু। কিন্তু এটা সবসময় সরল-সোজা পথে চলে না। আশা এবং বাস্তবতার মধ্যে উত্থান-পতন আছে, সুবিচার-অবিচার আছে। মানুষের সৃষ্ট অপরাধ দমনের একটা বিষয় আছে। তবে কেবলমাত্র পুলিশিং দিয়ে অপরাধ দমন করা যায় না। এজন্য মানুষকে সঠিকভাবে তৈরি করার একটা বিষয় আছে। মানুষ যদি আইন, প্রতিবেশীর প্রতি তার দায়িত্ব, নাগরিক হিসেবে তার দায়িত্ববোধের বিষয়ে সচেতন হয়, তাহলে পুলিশের কাজ অনেক সহজ হয়।’
বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে আসা আবুল মোমেন বলেন, ‘আমরা মানুষ তৈরির কাজটা সফলভাবে করতে পারছি না। শিক্ষায় নানা সংকট দেখতে পাই। ওখানে যত সংকট থাকবে, পুলিশের ওপর চাপও তত বাড়বে। মানুষ তৈরিটা যদি সঠিকভাবে হয়, তাহলে পুলিশের ওপর চাপ কমবে। পুলিশ আরও অনেক ভালো কাজে, উন্নয়নের কাজে সময় দিতে পারবে। শিক্ষা এবং পুলিশিং-এটা যেন পাশাপাশি চলবার বিষয়। আমরা চেষ্টা করছি আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একসাথে চলতে হবে, তাহলে অপরাধ কমবে। সারাদেশে কোতোয়ালী থানার উদ্যোগ- একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে দুঃখের বিষয় হচ্ছে- আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কখনো কাঙ্ক্ষিত সেবা পাই না। শুধু পুলিশ নয়, সরকারি যে কোনো সংগঠন- সেটা ভূমি অফিস হতে পারে, হাসপাতাল হতে পারে, বিদ্যুৎ বিভাগ হতে পারে- প্রত্যাশিত সেবা আমরা পাই না। পুলিশের কাছ থেকে না পাওয়াটা বাস্তবতার চরম উদাহরণ। কিন্তু আমরা জনগণের কাছ থেকে যে সহযোগিতা চাই, সেটাও আবার কখনো কখনো পাই না।’
‘সেবার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু কর্তব্যে আমরা সবসময় অবিচল, আমরা সবসময় দায়িত্ববান। এটা আমরা বলছি, কারণ বাংলাদেশকে যদি আমরা আরেকটি হলি আর্টিজানের মতো হামলা থেকে মুক্ত রাখতে না পারতাম, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ চলে যেত। মেট্রোরেল-পদ্মা সেতু হত না। সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যেত। সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়ত। বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হত। অথবা আমরা মনুষ্য সৃষ্ট যে দুর্যোগ, সেই জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত না রাখতে পারতাম, তাহলে দেশে আ কি অবস্থা হত ? সেজন্য আমরা বলছি যে- আমাদের অনেক ভুলত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে সঠিক পথে রাখার বিষয়ে আমরা নাম্বার ওয়ান।’

মানুষকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতির কথা তুলে ধরে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘মানুষকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের যে কর্মকাণ্ড, সেখানে আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত লেভেলে পৌঁছতে পারিনি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমাদের কর্মকাণ্ড যেরকম কঠোর, উল্টো থানায় আসা মানুষদের ওপর আমরা সেরকম নরম এবং কোমল হতে পারি না। আমরা সেভাবে মনযোগ দিতে পারি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা। আবার এই ব্যর্থতার জন্য আমাদের যুক্তিও আছে।’
‘আমাদের থানাগুলোতে সঠিক পরিবেশ নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে জনবল। ঘটনা ঘটার পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ পৌঁছবে এটা যেমন জনগণের প্রত্যাশা, তেমনি আমাদেরও প্রত্যাশা থাকে, আমরা কত তাড়াতাড়ি পৌঁছব। কিন্তু আমাদের যানবাহন নেই, সেজন্য দ্রুত পৌঁছতে পারি না সবসময়।’
‘আমাদের একজন সাব ইন্সপেক্টর কয়দিন রাতে বাসায় ঘুমাতে পারে, কয়দিন তার স্কুলে সন্তানকে নিয়ে যেতে পারে কিংবা সন্তানের কথা চিন্তা করতে পারে কি না, এটাও গবেষণার বিষয়। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেসব পুলিশ অফিসার নবউদ্যমে কাজ করে আমাদের মধ্যে আশা জাগাচ্ছে, তার মধ্যে একজন কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য তার যে অভিপ্রায়, সেটা প্রশংসনীয়।’

মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার তাগাদা দিয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘থানার দেওয়ালে দেওয়ালে জঙ্গিবাদ, মাদক, ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে কথা আছে, তেমনি মানবিক পুলিশিংয়ের কথাও আছে। আমরা শুধু কঠোর ভূমিকা নেব আর মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণ করব না, সেটা যেন না হয়। এই কথাগুলো সবসময় বলতে চাই এবং সিএমপির সব ইউনিটে, সব থানায় কোতোয়ালীর মতো পরিবেশ তৈরি করতে চাই। মানুষ সহজে থানায় আসবে, তার সমস্যার কথা মন খুলে বলবে এবং পুলিশ দ্রুত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগটা নেবে।’
সামনে এগিয়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের অনেক ভুলত্রুটি আছে, অনেক অন্ধকারের দিক আছে। পিছনে যাওয়ার দিকগুলো অতিক্রম করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। এই সমাজ শতভাগ অপরাধমুক্ত হবে, এটা কল্পনা করি না। তবে অপরাধের পর অপরাধী ধরা পড়বে, এটা যেন ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে হয়। চট্টগ্রাম শহরে এমন কোনো অপরাধ নেই যা আমরা উদঘাটন করতে পারিনি, দু’য়েকটি ছাড়া। এক্ষেত্রে আমরা ৯৫ ভাগ সফল। একইভাবে মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের ক্ষেত্রেও আমরা সফল হতে চাই।’
সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ওসি মোহাম্মদ মহসীন। এছাড়া সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোস্তাক আহমেদ খান, উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান, ইউসিবিএল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আনিসুজ্জামান রনি বক্তব্য রাখেন।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ফুলকি স্কুলের অধ্যক্ষ শীলা মোমেন, নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মো. আব্দুর রউফ, কোতোয়ালী জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা ও চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার রাইসুল ইসলাম, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কলিম সরওয়ার, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হাসান মাহমুদ হাসনী, জহরলাল হাজারী, গিয়াস উদ্দিন ও আনজুমান আরা বেগম এবং কারিতাস, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জেমস গোমেজসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।