ঢাকা: রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু রোগী সংখ্যা। সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত বা বেসরকারি— সব হাসপাতালেই ডেঙ্গু রোগীর ভিড়। সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট এবং সামর্থের সবটুকু ব্যয় করেও সরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) সরেজমিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় ডেঙ্গু রোগীর ভিড়। কেউ বেডে, কেউবা বারান্দায়, কেউ বাইরে বসার স্থানে, কেউ ফ্লোরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মোট কথা পুরো হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীতে সয়লাব।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৬শ শয্যার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। অর্থাৎ দেশের সর্ববৃহৎ এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢামেকে ভর্তি হয়েছেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আশিক হাসান। গত পরশু ঢাকা মেডিকেলে এসে রক্ত পরীক্ষার পর তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর থেকেই সে হাসপাতালে ভর্তি। বেড খালি না থাকায় ফ্লোরেই চিকিৎসা চলছে তার।
আশিক হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘বেড না পেয়ে বাধ্য হয়েই ফ্লোরে থাকতে হচ্ছে। অপরিচ্ছন্ন ফ্লোর শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও কিছু করার নেই।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আলাউদ্দিন-আল-আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আনুমানিক ৮শ জনের মতো ডেঙ্গু রোগী ঢামেকে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা কোনো রোগীকে আমরা ফিরিয়ে দিচ্ছি না। তাদের চিকিৎসা সেবা দিতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান দিতে না পারার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রোগীর সঠিক হিসাব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, সারাদিনে রোগী ভর্তি হচ্ছে, আবার সুস্থ হয়ে মেডিকেল ছেড়ে চলেও যাচ্ছে। তাই সঠিক হিসাব বলা মুশকিল হয়ে পড়েছে। যে ফিগারটা আমরা বলেছি, তার থেকে দুয়েকজন কম-বেশি হতে পারে।’
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে প্রয়োজনে নির্মাণাধীন ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে একটি ইউনিট খোলা হবে। সেখানে রেখে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।’
তিনি জানান, ডেঙ্গু রোগীদের সেবার জন্য ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সব চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ছুটি বাতিল ও কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার আরেক হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বিএসএমএমইউ) একই চিত্র। সেখানেও বেডের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি। ঢাকা মেডিকেলের চেয়ে এই বিএসএমএমইউ’র চিকিৎসাসেবা কিছুটা ভাল— এমনটিই ধারণা সাধারণ রোগীদের। তাই অনেকেই টাকা খরচ করে বিএসএমএমইউতে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা নিচ্ছেন।
রাজধানীর পান্থপথ সিগন্যালের হাসপাতাল হেলথ এন্ড হোপ। এখানে ডাক্তারের চেম্বারেও রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে। খুব ইমর্জেন্সি না হলে অন্য রোগীদের ভর্তি স্থগিত রাখা হয়েছে। সারাবাংলার বার্তা সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌসি জানান, তিনি তার মা ও মেয়েকে নিয়ে গত ৩০ জুলাই রাত ১২টায় হেলথ এন্ড হোপে আসেন। ওই সময় কোনো সিট ফাঁকা ছিল না। এক দিন পর তিনি একটি সিট ফাঁকা পেয়ে সেখানে মা ও ভাগ্নেকে ভর্তি করেন।

জান্নাতুল তার অভিজ্ঞতা থেকে জানান, সিট না থাকলেও ওই রাতেই সিরিয়াস এক ডেঙ্গু রোগীর ফোন আসলে হেলথ এন্ড হোপের ডা. লেনিন চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে তাকে আসতে বলেন। হাসপাতালের ম্যানেজার তাকে জানান সিট না থাকার কথা। এমনকি ডায়ালাইসিস রুমেও ডেঙ্গু রোগী থাকার কথা জানান। তখন ডা. লেনিন বলেন, আসুক! আমার চেম্বারে দিও।
বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জরুরি রোগী ছাড়া সব বেড ডেঙ্গু রোগী দিয়ে ভর্তি। বিভিন্ন হাসপাতালে সিট সংকট থাকায় অনেকেই ফোন করে জানিয়ে রাখছেন। সিট ফাঁকা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের খবর দেওয়া হচ্ছে।
এদিনে দুপুরে ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। যারা ভর্তি হতে এসেছেন। কিন্তু সিট না থাকায় ভর্তি হতে পারছেন না। এর মধ্যে মুগদা হাসপাতালে সিট না পেয়ে এসেছেন আবু কাহহার ও শিউলী মজুমদার দম্পত্তি। এই দুজনের মধ্যে স্ত্রীর অবস্থা ভালো না।

আবু কাহহার সারাবাংলাকে জানান, প্রথমে খিলগাঁয়ের খিদমাহ হাসপাতালে গিয়ে সিট পাননি। সেখান থেকে মুগদা হাসপাতালে গিয়েও সিট পাননি তারা। পরে সেন্ট্রাল হাসপাতালে এসেছেন। তার স্ত্রীর প্লেটলেট এখন এক লাখ ২৫ হাজার। বমি হচ্ছে। তার অবস্থা খুব খারাপ। ডাক্তাররা সিট দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের উপপরিচালক একেএম মোজাহের হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছি। সিট না থাকায় অধিকাংশকেই চিকিৎসাপত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেড়েছে। গত তিনদিন রোগী সামাল দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
একই চিত্র কল্যাণপুর ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্তত ৩৫ জনকে এ হাসপাতালের অর্ভ্যথনা কেন্দ্রে বসে থাকতে দেখা গেছে। ধানমণ্ডি বাংলাদেশ মেডিকেলের চিত্রও একই রকম। জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফয়সাল আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জরুরি বিভাগে ৬৪ জন রোগী এসেছেন, যাদের অধিকাংশই ডেঙ্গু আক্রান্ত।
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর পরিস্থিতি বুঝে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। সিট না থাকায় অনেক সিরিয়াস রোগীকেও ভর্তি করানো যাচ্ছে না। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় একটি পুরুষ ওয়ার্ডে ৩০টি শয্যা এবং একটি নারী ওয়ার্ডে ৩০টি শয্যা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু রোগীদের রাখা হয়েছে।’
মিরপুরের টেকনিক্যালে বারডেম হাসপাতালের দ্বিতীয় শাখার লজিস্টিকস বিভাগের ব্যবস্থাপক আশরাফুল হক শাওন জানান, ডায়াবেটিসের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল হলেও তারা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা সেল খুলেছেন। সেখানে বর্তমানে ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন।
মগবাজারের রাশমনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালের সাধারণ বেড ৪৫টি, এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ ২০টি, ১২টি আইসিইউ এবং ১২টি সিসিইউ বেড আছে। এসব শয্যার বেশিরভাগেই ডেঙ্গু আক্রান্তদের রাখা হয়েছে। হাসপাতালের সহকারী ব্যবস্থাপক তামান্না জামান অন্তু বলেন, রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অনেক রোগীকে ফেরত পাঠাতে হচ্ছে।’
এদিকে, ৫শ শয্যা বিশিষ্ট মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন আছে প্রায় ৩শ ডেঙ্গু রোগী। এদের মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ডে ১৭৫ জন, শিশু ওয়ার্ডে ৭৫ জন এবং কেবিনে ২০ জনের মতো। বেড-ফ্লোর কোথাও ফাঁকা না থাকায় এই হাসপাতাল আসা ডেঙ্গু রোগী অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে।
মুগদা হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. খাইরুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে। কিন্তু অনেক সময় পেরে উঠছি না।’