।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।
চট্টগ্রাম ব্যুরো: কেউ খাঁচায় বন্দি। কারও পায়ে শেকল। নানা নাম, নানা আকৃতি। বাহারি রঙ। কিচিরমিচির শব্দের ভেতরে কোনো পাখির কণ্ঠে আবার মানুষের মতো কথাও। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সাইন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) খেলার মাঠজুড়ে যেন সৌখিন পাখির রাজ্য!
মেলা প্রাঙ্গণে সাঁটানো প্রচারপত্রে স্লোগান- ‘বনের পাখি বনে রবে, খাঁচার পাখি বন্ধু হবে’। বনের পাখিকে বাঁচাতে খাঁচার পাখির করুণ আর্তি দর্শনাথীদের কাছে।
শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে দিনব্যাপী এই পাখিমেলার উদ্বোধন করেন সিভাসু উপাচার্য ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ। গত চারবছর ধরে সিভাসুতে এই মেলার আয়োজন হয়ে আসছে।
সিভাসু উপাচার্য ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে বিশেষত শিশু, কিশোর-তরুণদের মধ্যে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা জন্মানোর উদ্দেশ্য নিয়ে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। পাখি কিংবা পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা মানুষের মধ্যে নিঃসঙ্গতা থাকলে সেটা দূর করে। বাজে চিন্তা, মাদক আসক্তি থেকে দূরে রাখে। বিদেশে পোষা প্রাণীকে সন্তানতুল্য ধরা হয়। আমাদের দেশেও যেন এই মনোভাব ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।

চট্টগ্রাম বার্ড বিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকটি স্টলে দেখা গেছে হরেক রকমের বিদেশি পাখির সমাহার। প্রায় ৪০ প্রজাতির বিদেশি পাখি নিয়ে মেলায় এসেছেন বিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন। তার ভাণ্ডারে থাকা হল্যান্ড থেকে আনা কোকাটো, অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা লরাকিড ও ইক্ল্যাকটাস, গালাকক নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের। সাদা রংয়ের মাথায় হলুদ ঝুটির ‘কাকাটো’ দিব্যি ‘বাবা’ ডেকে যাচ্ছে।
জিয়াউদ্দিন সারাবাংলাকে জানান, হল্যান্ড থেকে আমদানির পর গত তিনবছর ধরে তিনি পালন করছেন কাকাতুয়া আদলের কোকোটা পাখি। নারী-পুরুষ উভয়লিঙ্গের কোকোটা আছে তার কাছে। লরাকিড পাখি দেখে বোঝার উপায় নেই সেটি নারী নাকি পুরুষ। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে লিঙ্গ নির্ধারণ করতে হয়েছে। গালাককেরও ডিএনএ টেস্ট প্রয়োজন হয়। এক জোড়া লরাকিডের দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

চট্টগ্রাম নগরীর বৌবাজার এলাকার বাসিন্দা জিয়াউদ্দিন পেশায় সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০০৪ সালে ছোটবেলা থেকে পাখি পোষা শুরু করেছিলাম। প্রথমে শখের বশে করেছি। এখন বাণিজ্যিকভাবে করছি। এখন পাখির প্রজনন করি। বিক্রি করি। আমার কাছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৪৫০ পাখি আছে। প্রথমে বাসায় সবাই খুব বাধা দিত। এখন তো জজ-পুলিশ কমিশনাররাও আমার পাখি দেখতে আসেন।’
বিরল পাখি ম্যাকাও বসেছে আলাদা সাম্রাজ্য পেতে। তোতা পরিবারভুক্ত এই পাখিটি বিশ্বে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। মেলায় সবচেয়ে বেশি আছে লাল-সবুজ ম্যাকাও। স্কারলেট ম্যাকাওসহ আরও বিভিন্ন প্রজাতিও আছে মেলায়।

আমাজানের ম্যাকাও নিয়ে মেলায় এসেছেন চট্টগ্রাম বার্ড বিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফেসবুক অ্যাডমিন শোয়েব উদ্দিন শাহ। তিনি সারাবাংলাকে জানান, পুরো চট্টগ্রামে এই পাখি আছে ১৫-১৬টি। এই পাখি গড়ে ৭৫ বছর বাঁচে। চট্টগ্রামে এখনও এই পাখির প্রজনন হয়নি। তবে ঢাকা ও সিলেটে হয়েছে।
মেলায় আনা ম্যাকাওয়ের সম্ভারে সবচেয়ে দামি হচ্ছে স্কারলেট। শোয়েব জানালেন, এই পাখি ব্রাজিল থেকে আনা হয়েছে। শিশু অবস্থায় এই পাখির দাম প্রতিটি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দাম ৭-৮ লাখ টাকা। এই পাখি গড়ে ৫০-৬০ বছর বাঁচে।
ত্রিশোর্ধ শোয়েব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই বাসায় পাখি পুষতাম। তখন শখের বশে করতাম। এখন বাণিজ্যিকভাবে করি। পাখির প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এই ব্যবসা সম্ভব নয়।’

হল্যান্ড, আমেরিকা, চীন, ভারত, পাকিস্তান থেকে আনা হরেক রকমের কবুতরও এসেছে মেলায়। একটি স্টলে দেখা গেছে ১০টি বিদেশি প্রজাতির পাশাপাশি দেশি কবুতরও। স্টলের কর্মকর্তারা জানালেন, বিদেশি কবুতরের মধ্যে শেহর, বিউটিহোমা, ক্যাপাচিনো, জগবিন, পেশোয়ারি, পোর্টার, তার্কির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
মেলায় আছে হরেক রকমের ‘লাভ বার্ড’ও। প্রতি জোড়া লাভ বার্ড কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা দাম হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা।
মেলায় ৮০ প্রজাতির প্রায় ৫০০ বিদেশি পাখি এসেছে বলে জানিয়েছেন মেলায় আয়োজকদের অন্যতম প্রাণী চিকিৎসক ডা. মো. সাদ্দান হোসাইন।

শুধু কি পাখি, ঘরে পোষা বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির কুকুরও এসেছিল মেলায়। নগরীর ও আর নিজাম রোড থেকে উইম্যান চেম্বারের পরিচালক ইয়াসমিন আরা আরজু গিয়েছিলেন তার আদরের পোষা কুকুর ম্যাক্স ও মায়াকে নিয়ে। ম্যাক্স ‘আমেরিকান স্কিমো’ প্রজাতির কুকুর এবং মায়ার জাপানি চিচুয়া প্রজাতির।
দুই মাস বয়সী থাকাবস্থায় দুই বছর আগে এই দুটি কুকুর আরজু উপহার পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন চট্টগ্রাম শহরের ফ্ল্যাটে কুকুর পুষতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। একটি প্রাণীর প্রতি চরম অবমাননা। আমার ফ্ল্যাটে আমি কি রাখব, সেটা তো অন্য কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারে না।’

নগরীর বাদশা মিয়া রোড থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আশিক গিয়েছিলেন ‘জার্মান স্পিচ’ প্রজাতির একটি কুকুর নিয়ে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই কুকুর জার্মান প্রজাতিগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত শান্ত প্রকৃতির।’
তবে গতবারের চেয়ে এবারের মেলায় পাখি-কুকুরসহ পোষা প্রাণীর সমাহার কম বলে জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা। তারা বলেছেন, এবার মেলার পরিসর বড় হয়েছে, কিন্তু প্রাণী সংখ্যায় কম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকার একটা পাখি পালনকারী গ্রুপ এবারের মেলায় আসতে পারেনি। এছাড়া হঠাৎ করে গরম পড়ে গেছে। বিদেশি কুকুর গরম সহ্য করতে পারে না। এজন্য অনেক মালিক সকালের রোদের মধ্যে কুকুর আনেননি।’

মেলার বিভিন্ন স্টলের মধ্যে লিঙ্গ নির্ধারণে ডিএনএ টেস্ট, প্রাণীরোগের ওষুধ, খাবারের দোকানও আছে। আর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে ‘সংকটাপন্ন বন্যপাখি’ শিকার না করার আহ্বানসম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন।
উপাচার্য সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা মেলায় কোনো ধরনের বন্যপাখি আনার অনুমতি দিইনি। শুধুমাত্র খাঁচায় বসবাসের উপযোগী পাখিগুলো আনার অনুমতি দিয়েছি। খাঁচায় যেসব পাখির বসবাস, সেগুলো সাধারণত মানুষের সংস্পর্শে থাকে। সেগুলোকে যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, বনে উড়ে যেতে পারবে না। এছাড়া হিংস্র পাখির আক্রমণেরও সম্ভাবনা থাকে। ছেড়ে দিলেও সেগুলো আবারও খাঁচায় ফিরে আসবে। আর বন্যপ্রাণীকে ধরে যদি খাঁচায় পুরি, তাহলে সেগুলো বাঁচবে না। সেজন্য বলা হচ্ছে- বনের পাখি বনে রবে, খাঁচার পাখি বন্ধু হবে।’
সারাবাংলা/আরডি/এমআই