।। হাবিবুর রহমান, সিনিয়র ফটো করেসপন্ডেন্ট ।।
ঢাকা: চকবাজারেই তাদের কসমেটিকসের দোকান। সেদিন ছোট ভাই অপু রায়হান আর নিজের তিন বছর বয়সী ছেলে আরাফাতকে নিয়ে দোকান থেকে বের হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী। গলিতে হাঁটা শুরু করা মাত্রই বিকট শব্দ। কিছু বুঝতে না পেরে সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাতেই ছেলে আরাফাতকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন মোহাম্মদ আলী। আরেক ভাই অপুও তখন তাদের সঙ্গে, আর সেখানেই মৃত্যু হয় তাদের—এভাবেই দুই ভাই ও ভাতিজা হারনোর কথা জানালেন ছোট ভাই দিপু।
বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন তারা। সেসময় ভাইদের সঙ্গেই ছিলেন দিপু। কিন্তু একটু সামনে থাকাতেই প্রাণে বেঁচে যান তিনি। দিপু জানান, দুই ভাইকে জানিয়ে দোকান বন্ধ করার একটু আগেই বের হয়েছিলেন তিনি। খানিক যেতেই শোনেন বিকট শব্দ। আর পেছনে ফিরে দেখেন দুই ভাই ও ভাতিজার লাশ।
দিপু বলেন, ‘আমি ঘটনাচক্রে বেঁচে গেলাম। কিন্তু এ বেঁচে থাকা কী জন্য জানি না! সারাজীবনেও চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এ নির্মম ঘটনা ভুলতে পারব না। রাত ১০টার থেকে একটু বেশি হবে। আমরা বন্ধুরা মিলে ২১ ফেব্রুয়ারি ঘুরতে যামু প্ল্যান করতেছি। এরমধ্যে দুই ভাইকে দোকানের চাবি দিয়ে বললাম, ভাই আমি একটু আহি। ১০০ হাত দূরে যাওয়ার পর দেখলাম বিকট শব্দ। এরপর শুধু তাকাই দেখি শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। দেখি সাপের মতো আঁকা-বাঁকা হয়ে গলির মধ্যে আগুন সবাইকে দোঁড়াইত্যাছে। নিজেকে বাঁচাতে পারলেও আমার বড় দুই ভাই আর ছোট শিশু আরাফাত দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে।’

দিপু জানান, তার দুই ভাই ও ভাতিজার শরীরে পোড়া বা অন্য কোনো ক্ষতের চিহ্ন নেই। বড় ভাই বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনে কোনো গলির চিপায় বসে পড়েন। বাবুকে নিয়ে বসা অবস্থাতেই মারা যান। ‘আমরা কারো ক্ষতি করিনি। আমাগো তিনভাইকে সবাই বলত এরা বন্ধু, এত মিল ক্যামনে থাকে’—কেবলই বিলাপ করছিলেন দিপু।
দিপু, মোহাম্মদ আলী ও অপু চকবাজার এলাকায় কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। রহমতগঞ্জ ছাপড়া মসজিদ এলাকায় দিপুদের যৌথ পরিবার। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে দিপুই সবার ছোট। এদিন বাবার দোকান দেখতে শখ করে চাচাদের সঙ্গে এসেছিলো তিন বছরের শিশু আরাফাত। নিহত মোহাম্মদ আলীর বয়স ৩৩ বছর, তার স্ত্রী সাত মাসের গর্ভবতী। ছোট ভাই অপুর বয়স ৩০, তার চার মাসের জোনাইরা নামে এক কন্যা রয়েছে।
শুক্রবার (২২ ফেব্রুয়ারি) মোহাম্মদ আলী, আরাফাত ও অপুকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এসময় ভাইয়ের কবর জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন বড় ভাই কোরবান আলী। দিশেহারা বড় ভাই কেঁদে কেঁদে বলতে থাকেন, ‘আমাকে আর কে বুকে ধরে বলবে, তোমার কি লাগবে ভাই? আমার সব কেড়ে নিল সর্বনাশা আগুন।’

রহমতগঞ্জে দিপুদের বাসায় চলছে শোকের মাতম। তাদের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। বোন জরিনা বেগমকে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। কখনো চিৎকার করে, কখনো হাউমাউ করে কাঁদছেন তিনি। কান্না করতে করতে জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছেন কয়েকবার।
জরিনা বারবার শুধু বলছিলেন, ‘আমার ভাইয়েরা ফিরবে, ফিরবে। আরাফাত, আমার কলিজার টুকরা, আমার কলিজার টুকরা মোহাম্মদ আলী, ওই কই গেল, কই গেল? আমি কই পামু, ওই আরাফাত। এত মানুষ দেহি, অগো দেহি না ক্যা? অগো দেহি না ক্যা? মোহাম্মদ আলী কই গেল?’
সারাবাংলা/এইচআর/এমও