Friday 26 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অস্থির চালের বাজার


৯ জানুয়ারি ২০১৯ ২১:২৯ | আপডেট: ৯ জানুয়ারি ২০১৯ ২২:৩০
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

।। রমেন দাশগুপ্ত ও এমদাদুল হক তুহিন ।।

আমন মৌসুম শেষে কৃষকের গোলায় ধান ওঠার দুই মাসও পার হয়নি। কৃষকের ঘরে এখনো পর্যাপ্ত ধান আছে। এরপরও চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ভোক্তা ও খুচরা ব্যবাসায়ীদের অভিযোগ, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে চালকল মালিকরা অসম প্রতিযোগিতা করে চালের দাম বাড়িয়েছেন। তারা আরও বলছেন, নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে (২৭ ডিসম্বের) থেকেই মিল মালিকরা বাজারে চালের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনের সময় সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলাকে পুঁজি করে বিপুল অঙ্কের মুনাফারও স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। এই সুযোগে স্থানীয় চাল সংগ্রহকারীরা (ফড়িয়া) বাড়িয়ে দিয়েছেন ধানের দাম। সেই ধান থেকে পাওয়া চাল বাজারে আসতে আরও সময় লাগলেও মিল মালিকরা বসে নেই। তারা বাড়িয়ে দিয়েছেন চালের দাম। এরই প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। আবার সরকারের কাছে বিক্রির জন্য ধান সংগ্রহে বেশি মনযোগী হওয়ায় বাজারে চাল সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছেন মিল মালিকরা। এর ফাঁকেও চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে, ভোক্তা ও খুচরা ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিল মালিকরা। আর খাদ্য বিভাগ বলছে, সরকারের চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে ইস্যু বানিয়ে মিল মালিকরা ধান সংগ্রহের প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন, যার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।

বিজ্ঞাপন

সিলেটেও অস্থির চালের বাজার

জানা গেছে, সাধারণত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করেন স্থানীয় ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। সেই ধান যায় আড়তদারের কাছে। আড়তদার থেকে কিনে নেন মিল মালিকরা। আর মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করে সরকারের খাদ্য বিভাগ। পাইকারি ক্রেতারাও তাদের কাছ থেকে কেনেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিযোগিতার কারণে ধানের দাম বাড়লেও কৃষকের কাছে বাড়তি দাম পৌঁছাচ্ছে না। মাঝখান থেকে ফড়িয়া, আড়তদার ও মিল মালিকরা বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

গত এক সপ্তাহে রাজধানীর খুচরা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে কেজিতে সর্বোচ্চ ৫ টাকা। বর্তমানে ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় মিনেকেট বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এ জাতীয় চাল মিলেছে ৫০ টাকায়। আটাশ চালের দামও ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৫ টাকায়। আর বস্তা প্রতি সাধারণ চালের দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। তবে, বাজারে নাজির জাতীয় চালের দাম স্থির আছে। আর পোলাও চালের দাম বেড়েছে বস্তাতে ৫০০ টাকা।

কাওরানবাজারের হাজী ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের মালিক মো. জসিম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘দাম বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতা কমেছে। আমরা গল্প করে সময় কাটাচ্ছি। তবে নতুন করে চালের দাম বাড়েনি, কমেওনি। মিনিকেট পাইকারি বাজারে ৫২ টাকা, আর খুচরা বাজারে ৫৪ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

কিচেন মার্কেটের চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. লোকমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচনের ৪ দিন আগে থেকে মিলাররা চাল সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। তারা বলেছে ভোটকে সামনে রেখে সবাই ছুটিতে ছিল। নির্বাচনের আগে চালের ডেলিভারি দিতে পারেনি। তবে এখনো তারা সরবরাহ বাড়াননি। বরং নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন।’

একই ধরনেরর কথা বলেন লাকসাম ট্রেডার্সের কর্মচারী মো. মোশাররফ। সরাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দেখে গেছি চালের দাম ঠিকই আছে। এসে দেখি সব ধরনেরর চালের দাম বেড়ে গেছে। গাড়ি বন্ধ থাকবে এই অজুহাতে নাকি চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।’

এদিকে, গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে সব ধরনের চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীতে চালের পাইকারি বাজার আছে দু’টি। একটি চাক্তাই অন্যটি পাহাড়তলী। দুই বাজার ঘুরে জানা গেছে, বেতি ও স্বর্ণা আতপ বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে ১৭০০ টাকা, নাজিরশাইল সিদ্ধ বস্তাপ্রতি ২৫০ টাকা বেড়ে গিয়ে এখন বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৬৫০ টাকায়। এছাড়া জিরাশাইল সিদ্ধ ২৫০ টাকা বেড়ে দুই হাজার ৪৫০ টাকা, মিনিকেট সিদ্ধ ২০০ টাকা বেড়ে এক হাজার ৮৫০ টাকা ও স্বর্ণা সিদ্ধ বস্তাপ্রতি ১৫০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬৫০ টাকায়।

অন্যদিকে, মিনিকেট আতপ বস্তায় ২৫০ টাকা বেড়ে দুই হাজার ৫০ টাকা, বাসমতি সিদ্ধ ১০০ টাকা বেড়ে এক হাজার ৬০০ টাকা, কাটারিভোগ আতপ ১০০ টাকা বেড়ে দুই হাজার ৬০০ টাকা, দিনাজপুরী পাইজাম ১৫০ টাকা বেড়ে এক হাজার ৮৫০ টাকা, চিনিগুঁড়া চাল ২০০ টাকা বেড়ে তিন হাজার ৯০০ টাকা এবং মোটা সিদ্ধ চাল ২০০ টাকা বেড়ে গিয়ে এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকায়।

চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি চাহিদা আছে বেতি ও স্বর্ণা আতপ চালের। এই দু’জাতের চালের দাম বস্তাপ্রতি মাত্র ১০০ টাকা বেড়েছে। কেজিপ্রতি বেড়েছে ২ টাকা। সরকার চাল সংগ্রহ করেছে ৩৬ টাকায়। আর আমরা স্বর্ণা কেজিপ্রতি ৩২-৩৩ টাকা এবং বেতি বিক্রি করছি ৩৩-৩৪ টাকায়। সে হিসাবে, দেশে যে চালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, সেই চালের দাম খুব বেশি বাড়েনি। নির্বাচন মাত্র শেষ হয়েছে, সেজন্য এই মুহুর্তে চালের দাম বেড়ে যাওয়াটা বেশি আলোচিত হচ্ছে।’

পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম নিজাম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মিল মালিকরা হঠাৎ করে চাল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। অথচ তারা বাড়তি দামে যে ধান সংগ্রহ করছেন, সেগুলো বাজারে পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে। মজুদ থাকা ধান-চাল বাড়তি দামে বিক্রির জন্য মিল মালিক সিন্ডিকেটের এই কৌশল।’

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি শান্ত দাশ গুপ্ত সারাবাংলাকে বলেন, ‘আড়তদারদের কাছ থেকে যে ধান আমরা একমাস আগে মণপ্রতি ৬৫০ টাকায় কিনেছি, গত কয়েকদিনে সেই ধান কিনতে হচ্ছে ৭৮০ টাকায়। এই ধান থেকে পাওয়া চাল আমরা যখন বাজারে বিক্রি করছি, স্বাভাবিকভাবেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

মিল মালিকদের এই অজুহাত মানতে নারাজ চট্টগ্রামের পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, মিল মালিকদের কাছে এখনো বোরো মৌসুমের চাল মজুদ আছে। এখনো আমন মৌসুমের চাল খুব বেশি বাজারে সরবরাহ করা হয়নি। কম দামে সংগ্রহ করা পুরনো চাল বেশি দামে বাজারে সরবরাহ করছেন মিল মালিকরা।

এ প্রসঙ্গে শান্ত দাশ গুপ্ত সারাবাংলাকে বলেন, ‘বোরো মৌসুমের ধান আছে কৃষকদের কাছে। মূলত বেশি দামে ধান বিক্রি হচ্ছে সেগুলোই। পুরনো ধানের দাম বেড়েছে। আর বাজারে বেড়েছে পুরনো চালের দাম।’

তবে ওমর আজম মিল মালিক সিন্ডিকেটের ওপর পুরোপুরি দোষ দেননি। তার মতে, ‘মিল মালিকরা বাজার থেকে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করছেন, সেই পরিমাণ সরকারকে সরবরাহ না করে মজুদ করছেন। এর ফলে বাজারে ধানেরও একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ধানের দাম বেড়েছে। চালের দামও বেড়েছে।’ সরকার যদি মিল মালিকদের ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নজরদারির আওতায় আনে তাহলে চালের বাজারের পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করেন ওমর আজম।

হঠাৎ চালের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি-অর্থনীতিবিদ ড. আসাদুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ সময়ে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। চালের দাম বাড়ার পেছনে আমি সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কছিু দেখছি না। চালকলে আগে যারা মালিক ছিলেন, এখনো তারাই আছেন। ফলে দাম বাড়ার কারণটি তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

জনতা রাইস মিলের মালিক আবু ওসমান বলেন, ‘মিলাররা বলছে ধানের বাজার বাড়তি, তাই চালের দাম বাড়তি। রশিদের মিনিকেট আগে ২ হাজার ৪৫০ টাকা বিক্রি হলেও এখন ২ হাজার ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এসিআইয়ের মিনিকেটের বস্তা ২ হাজার ৪৫০ টাকা বিক্রি হলেও এখন ২ হাজার ৫০০ টাকা। বস্তাতে চালের দাম ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কেজিতে এক থেকে দেড় টাকা।’

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্ন অ্যাসোসিয়শনের সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিলগুলোতে কর্মচারীরা নির্বাচনের ছুটিতে থাকায় চালের সরবরাহ কিছুটা কমেছে। তবে চালের দাম তেমন বাড়েনি।’

বাজারে মিনিকেটের দাম সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে জানালে লায়েক আরও বলেন, ‘মিনিকেট নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। এটা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে এ চালের দাম কিছুটা কম থাকলেও দিন যত বাড়তে থাকবে এ জাতীয় চালের দামও বাড়তে থাকবে।’

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্ন অ্যাসোসিয়শনের সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাজারে ধানের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা কমে গেছে। ফলে চালের দামও কমেছে।’ বাজার নিয়ন্ত্রণকারী এই মিলারের দাবি, ‘বর্তমানে কোনো ক্রেতা নেই। আমরা চাল বিক্রি করতে পারছি না। ’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শাহ জামাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার গত ১ ডিসেম্বর থেকে ৩৬ টাকা দরে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করছে। এই কার্যক্রম চলবে পুরো ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জেলা খাদ্য বিভাগ স্ব-স্ব জেলার মিল মালিকদের সঙ্গে চাল কেনার চুক্তি করেছে। চুক্তি লঙ্ঘন হলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। এখন জামানত বাঁচাতে মিল মালিকরা ধান কেনার প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। সব কিছুরই একটা প্রতিক্রিয়া আছে। এই প্রতিযোগিতার কারণে ধান-চাল দুটারই দাম বেড়ে গেছে।’ তবে, কৃষকরা কিছু বাড়তি দাম পাচ্ছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে, চালের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন জেলার চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার (১০ জানুয়ারি) বৈঠকে বসছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এই প্রসঙ্গে মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি) সচিবালয়ে প্রথম অফিসে এসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটি জেলার চালকল মালিক সমিতির প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি ও চাল ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে ১০ তারিখে (জানুয়ারি) বসবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয় অনেক বড় মন্ত্রণালয়। এটাও ঠিক খুবই সেনসিটিভ মন্ত্রণালয়।’ চালের দাম দুই টাকা কমলে দোষ, দুই টাকা বাড়লেও দোষ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চালকল মালিকদের সঙ্গে খাদ্যমন্ত্রীর বৈঠক প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘চালের বাজার পর্যালোচনা করতেই চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। দেখা যাক, আলোচনায় কী উঠে আসে, কী পাওয়া যায়।’ আলোচনার ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

সারাবাংলা/আরডি/ইএইচটি/এমএনএইচ