ঢাকা: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে বিশেষজ্ঞরা আরও শক্তিশালী, সমন্বিত ও টেকসই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার (২২ আগস্ট) ঢাকার হোটেল শেরাটনে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) আয়োজিত ‘কনফ্লুয়েন্স ২০২৬: অংশীদারিত্ব, প্রশংসা ও অঙ্গীকারের এক সমাবেশ’-এ এই আহ্বান জানানো হয়।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর গণ-স্থানান্তরের নবম বার্ষিকী উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সহায়তাকারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর অবদান ও অংশীদারিত্বকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন এবং রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যান্য টেকসই সমাধানের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দায়ভার বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত তাদের। রোহিঙ্গা সংকটকে কোনোভাবেই বিস্মৃত সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।”
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানকে আমাদের অন্যতম প্রধান পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমরা শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে চাইছি না; আমরা রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আইআরসি-র এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান বলেন, ৯ বছর কেটে গেছে, গতানুগতিক ধারা আমাদের দশম বা পঞ্চদশ বছরে নিয়ে যেতে পারবে না। তহবিল কমে আসায় এবং এই সংকট থেকে বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়ায়, আমাদের অবশ্যই একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে এবং সুরক্ষা ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে বসবাসকারীদের অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষা এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানবিক সহায়তার ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমে আসে,” বলেন রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী লাকি করিম।
অনুষ্ঠান চলাকালীন দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রোহিঙ্গা কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি অভিন্ন রূপকল্প আলোচনার জন্য বাংলাদেশ সরকার, দাতা সংস্থা, মানবিক সহায়তা খাত, রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং শিক্ষাবিদদের একত্রিত করা হয়।
আলোচনাগুলোতে পরিবর্তনশীল মানবিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয় এবং টেকসই আন্তর্জাতিক সহায়তা, শক্তিশালী সুরক্ষা ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্তির গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্যানেলিস্টরা একটি দীর্ঘমেয়াদী, সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন, যা এই কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং আশ্রয়দাতা সম্প্রদায় উভয়ের অধিকার, মর্যাদা ও আকাঙ্ক্ষাকে স্থান দেবে।
প্যানেলিস্টদের মধ্যে ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া; শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান; অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির; বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে; বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের প্রতিনিধি হাম্মা হোসেন এবং আইআরসি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টরসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইআরসি-র আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি বিশেষজ্ঞ সাবিরা সুলতানা নূপুর।
অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ এবং রোহিঙ্গা-নেতৃত্বাধীন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।