ঢাকা: উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের একক প্রচেষ্টাকে অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ নির্ধারিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) কোনো করুণা বা দান নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যকার সুপ্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি প্রক্রিয়া। এজন্য সরকার, এনজিও এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে ফ্যাশন ডিজাইনার, তাঁত বিশেষজ্ঞ এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। বিভিন্ন জায়গায় পাইলট প্রজেক্ট চালিয়ে ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি সামাজিক শ্রেণির জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও অগ্রাধিকার নিশ্চিতের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিনদিনব্যাপী এসডিজি-বিষয়ক সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এসডিজির মূল উদ্দেশ্য অর্জনে প্রান্তিক পর্যায়ের হস্তশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের তৃণমূলের কারিগরদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করার সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এ বিশাল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, গ্রামে শীতলপাটি প্রস্তুতকারী বা কামারদের মতো কারিগরদের শুধু মূলধন দিলে চলবে না, বরং তাদের পণ্যের মান বৃদ্ধি ও বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। সেজন্য তাদের ভালো কাঁচামাল বা ইনপুট কেনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তাদের তৈরি ১০ টাকার পণ্যের মান বেড়ে ৩০ টাকায় উন্নীত হবে, যা কারিগরদের আয় বৃদ্ধি করবে এবং দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখবে। এ ধরনের উদ্যোগকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থায়ন প্রক্রিয়া বা মনিটাইজেশনের মধ্যে আনা না হলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। পাশাপাশি ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ে সহায়তা দিয়ে তাদের তৈরি পণ্য আলিবাবা, আমাজন বা ইবের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বিপণনের উপযোগী করে তুলতে হবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেখানে ঢাকার একটি নির্দিষ্ট স্থানে থিয়েটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলোকসজ্জা, মেকআপ শিল্পীসহ সব কারিগরকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হবে।
স্পোর্টস ইকোনমি বা ক্রীড়া অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, খেলাধুলার পেছনে বহুমাত্রিক খাত জড়িয়ে আছে, যার মাধ্যমে নতুন বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব।
থাইল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক মডেলের উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার মাধ্যমে সাধারণ গ্রামীণ পণ্যের গুণগত মান উন্নত করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা ই-কমার্সের মাধ্যমে রফতানি করা হয়। বাংলাদেশেও প্রান্তিক কারিগরদের এই বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে নীতিগত সহায়তা ও বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এসডিজি অর্জনের বহু আগেই বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও উন্নয়ন দর্শনে এর মূল রূপরেখা অন্তর্ভূক্ত ছিল- এমন দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলেই দেশে এসডিজি-বান্ধব বহু মূল ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার শতভাগ বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু এসডিজির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ হবে না, বরং বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকগুলোর চেয়েও আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এটি শুধু পলিসি বা খাতা-কলমের বিষয় নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একটি দৃঢ় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা দ্রুত প্রতিফলিত হতে যাচ্ছে।