নীলফামারী: স্বামী হারানোর পর একা সংসারের হাল ধরেছিলেন একজন সাধারণ গৃহিণী হিসেবে। সেই সংগ্রামই আজ তাকে দেশের অন্যতম সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা খাদিজা বেগম এখন কফি, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, কোকো, প্যাশনসহ নানা ধরনের বিদেশি ফল ও ফসল চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণনের মাধ্যমে অনন্য সাফল্যের নজির গড়েছেন। কৃষিতে তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এরই মধ্যে জয়িতা ও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। বেগম রোকেয়া পদকের মনোনয়নের জন্য নাম পাঠিয়েছে নীলফামারী জেলা প্রশাসন।
নীলফামারী জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে জলঢাকা উপজেলার কৈমারী গ্রামে খাদিজা বেগমের বাড়ি। ২০১৪ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। পরিবারের ব্যবসার পাশাপাশি কৃষিকাজের দায়িত্বও নিজ হাতে তুলে নেন তিনি।
ছেলের পরামর্শে ২০১৮ সালে বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত জমি পরিষ্কার করে শুরু করেন একটি আধুনিক ফলের বাগান। সেখানে ড্রাগন ফল, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডোসহ বিভিন্ন ধরনের ফল চাষ শুরু করেন।
২০১৯ সালে বাগানে যুক্ত হয় প্রায় সাড়ে ছয়শ কফি গাছ। দুই বছরের মাথায় গাছে ফল আসতেই বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নজরে আসে। পরে কৃষি বিভাগ তাকে আরও উন্নত জাতের কফির চারা এবং কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। বর্তমানে বিদেশি ফল, ফসল ও চারার পাশাপাশি কফি বিক্রি করে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইনে ভালো আয় করছেন তিনি।

খাদিজা বেগমের বাগানে চাষ করা কফি।
গ্রামীণ নারী ও কৃষিভিত্তিক শিক্ষিত বেকারদের উদ্দেশে খাদিজা বেগমের আহ্বান, চাকরির পেছনে না ছুটে বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমি কাজে লাগিয়ে কৃষিতে আত্মনিয়োগ করলে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।
উদ্যোক্তা খাদিজা বেগম বলেন, ‘২০১৪ সালে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানোর দায়িত্ব আমার ওপর পড়ে। স্বামীর ব্যবসায় বসার পাশাপাশি সংসার, ছেলেদের লেখাপড়া, বাগান এবং শ্রমিকের খরচ সবকিছুই আমাকে সামলাতে হয়েছে। আমার বড় ছেলে ঢাকায় থাকত। আমাদের বাড়ির পাশে অনেক পরিত্যক্ত জমি ও বাঁশঝাড় ছিল। সে আমাকে বলল, জায়গাগুলো পরিষ্কার করে একটি বাগান করা যায়। আমি তাকে সাহস দিলাম। এরপর ২০১৮ সালে আমরা ড্রাগন ফল, রাম্বুটান ও অ্যাভোকাডো দিয়ে বাগানের কাজ শুরু করি।’
তিনি বলেন, ‘পরে ধীরে ধীরে কফি চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ি। প্রথমবার প্রায় ৬৮০টি গাছ থেকে প্রায় ১০ কেজি কফি পেয়েছিলাম। এটি দেখে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আমাকে আরও নতুন জাতের কফির চারা দেয়। দুই বছর পর সেগুলো থেকেও ভালো ফলন পাই। প্রথমদিকে ড্রাগন ফল বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছি। বর্তমানে বাজারে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমলেও আমি এখনও নিরাপদ ও সতেজ ফল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমার বাগানে প্রায় ২০টি রাম্বুটানের চারা লাগিয়েছিলাম। এর মধ্যে আটটি মারা গেছে, বর্তমানে ১২টি গাছ রয়েছে। গত মৌসুমে মাত্র পাঁচটি গাছ থেকেই প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার রাম্বুটান বিক্রি করেছি। পাশাপাশি কফি তো আছেই।’

খাদিজার এই সাফল্যের পেছনে তার ছেলে শেফায়েত নাশরাত নয়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পদক্ষেপে মায়ের পাশে থেকে অনুপ্রেরণা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছেন তিনি।
শেফায়েত নাশরাত নয়ন বলেন, ‘আমার আম্মুর সহযোগিতায় আমাদের বাগান অনেক বড় হয়েছে। আমরা বিভিন্ন ধরনের অপ্রচলিত বিদেশি ফল নিয়ে কাজ করছি। কৃষি বিষয়ে আমার যে পড়াশোনা রয়েছে, তা আমরা এই বাগানেই বাস্তবভাবে প্রয়োগ করতে পারছি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আমাদের কাছে চারার অর্ডার দিচ্ছেন। তবে এই বাগান এত বড় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন আমার মা।’
কফি, রাম্বুটান ও কোকো চাষে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে খাদিজা বেগম ২০২২ সালে জয়িতা পুরস্কার অর্জন করেন। একই বছর তিনি মৎস্য চাষে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য উৎপাদক হিসেবেও সনদ পেয়েছেন তিনি।
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘অপ্রচলিত বিদেশি ফল একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি যেভাবে সফলভাবে উৎপাদন করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি মেশিন এরই মধ্যে তাকে দেওয়া হয়েছে। অল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আমরা সব সময় তার পাশে আছি। আগামীতে বেগম রোকেয়া পদকের জন্যও তার নাম মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’
বর্তমানে খাদিজা বেগমের তিন একর জমির বাগানে ২৪ প্রজাতির বিদেশি ফল ও ফসল রয়েছে। এর মধ্যে কফি গাছের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। নিজের সংগ্রাম, সাহস ও উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে তিনি শুধু একজন সফল নারী উদ্যোক্তাই নন, উত্তরাঞ্চলের বিকল্প কৃষিরও একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছেন।