Wednesday 15 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জলাবদ্ধতা থেকে স্বপ্নের খামার: কুমিল্লার প্লাবনভূমিতে মাছের বিপ্লব

মো. রাসেল, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ জুলাই ২০২৬ ২০:২০

কুমিল্লা: একসময় বর্ষা এলেই কুমিল্লার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যেত। বছরের পর বছর কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ে থাকত হাজার হাজার হেক্টর জমি। যে জলাবদ্ধতা একসময় ছিল স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কারণ, সেই প্লাবনভূমিই এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বাদুপানির মাছ উৎপাদন কেন্দ্র। সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ শুধু মাছের উৎপাদনই বাড়ায়নি, সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থান, বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনেছে নতুন গতি।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই প্লাবনভূমিভিত্তিক মাছ চাষ বর্তমানে জেলার হোমনা, তিতাস, মেঘনা, মুরাদনগর, চান্দিনা ও দেবিদ্বারসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয়দের দূরদর্শী উদ্যোগ, সমবায় ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চাষাবাদ কৌশলের সমন্বয়ে একসময় অনাবাদি থাকা জলাভূমি আজ পরিণত হয়েছে লাভজনক মৎস্য খামারে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্লাবনভূমির চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষের উদ্যোগ নেন। বর্ষার অতিরিক্ত পানিকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মাছ উৎপাদনের এ পদ্ধতি ধীরে ধীরে ব্যাপক সফলতা পায়। বর্তমানে শুধু দাউদকান্দি উপজেলাতেই রয়েছে অর্ধশতাধিক প্লাবনভূমি, যেখানে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হচ্ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার দাউদকান্দি, হোমনা, তিতাস, মেঘনা, মুরাদনগর, চান্দিনা ও দেবিদ্বারসহ বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে ৭৪টি প্লাবনভূমিতে প্রায় ৬ হাজার ৭৭০ হেক্টর এলাকায় মাছ চাষ হচ্ছে। এসব জলাশয় থেকে বছরে প্রায় ৭৩ হাজার ৯৭৮ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। জেলার চাহিদা পূরণ করে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা জাতীয় মাছ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে উৎপাদিত হওয়ায় কুমিল্লার প্লাবনভূমির মাছের স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মাছ কিনতে আসেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৎস্য খামারি, উদ্যোক্তা ও গবেষকরাও এই প্লাবনভূমিভিত্তিক চাষাবাদ সরেজমিনে দেখতে এবং এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে আসছেন।

তবে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতার মধ্যেও নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন মাছ চাষিরা। বিশেষ করে মাছের খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারপরও সম্ভাবনাময় এই খাতকে ধরে রাখতে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন উদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে ইলিয়টগঞ্জের মাছ চাষী মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমি প্রায় ১২ বছর যাবৎ মাছ চাষ করছি। তবে বর্তমানে মাছের খাদ্য সহ অন্যান্য খরচ বেরে যাওয়ার কারনে আমরা হিমসিম খাচ্ছি। সরকার যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করে তবে এ খাত থেকে আরও ভালো কিছু করা সম্ভব।’

চান্দিনার প্লাবন ভূমির মৎস্য চাষী মো. জাকির হোসেন কাজল বলেন, ‘প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করতে তেমন খাবার ব্যবহার করতে হয়না। প্রাকৃতিকভাবে খাবার খেয়ে মাছ বড় হচ্ছে৷ তাই এ মাছের স্বাদ ও গুনগতমান ভালো। এ জন্য কুমিল্লার পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যান্য জেলাতেও এ মাছের চাহিদা অনেক বেশি।’

কুমিল্লা থেকে মাছ কিনতে আসা ক্রেতা আব্দুল সাত্তার বলেন, ‘আমি কুমিল্লা থেকে এসেছি প্লাবন ভূমির মাছ চাষ ও মাছ ধরা দেখতে পাশাপাশি এখান থেকে তরতাজা ফ্রেশ মাছ কিনে নেওয়ার জন্য। আসলে এখানে এসে মাছ ধরা দেখে নিজেও নেমে গেলাম মাছ ধরতে। আসলে এ এক অন্যরকম অনূভুতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।’

কুমিল্লা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘দাউদকান্দির প্লাবনভূমি ভিত্তিক মাছ চাষ এখন সারা দেশের জন্য একটি সফল ও অনুসরণযোগ্য মডেল। নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই প্রকল্পের কার্যক্রম উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর থেকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে প্রতিবছরই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুমিল্লার সব উপজেলায় যে পরিমান মাছ চাষ হয় তা কুমিল্লা অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যায়। আর এ মাছের স্বাদ ও গুনগতমানের কারনে চাহিদা বেশি।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত মানের পোনা ও মাছের খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির আরও বিস্তার ঘটানো গেলে কুমিল্লার প্লাবনভূমিতে মাছ উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে এই খাত।

একসময় যে প্লাবনভূমি ছিল অব্যবহৃত ও অর্থনৈতিকভাবে অনুৎপাদনশীল, আজ সেটিই কুমিল্লার মানুষের সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সমবায়ের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জলাবদ্ধতাকে সম্পদে রূপান্তরের এই সাফল্য দেশের অন্যান্য জলাভূমি এলাকাতেও অনুসরণযোগ্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর