ঢাকা: নয়া সরকারের প্রথম মুদ্রানীতি (মনিটারি পলিসি) ঘোষণা করা হবে মঙ্গলবার (৩০ জুন) । দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই–ডিসেম্বর) জন্যও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ রাখার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আগামীকাল বিকেল ৩ টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে প্রথম মুদ্রানীতি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, মুদ্রানীতি প্রণয়নের আগে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ডলারের বাজার, বৈদেশিক লেনদেন ও সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে।
সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার সাড়ে ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না নামায় এবারও নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে দাঁড়ায়, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং মে মাসে মূল্যস্ফীতে বেড়ে দ্বারায় ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে উন্নীত হয়। ফলে মূল্যচাপ শুধু খাদ্যপণ্যে নয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন ও অন্যান্য সেবাখাতেও বিস্তৃত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল নীতি সুদহার উচ্চ রাখাই যথেষ্ট নয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কার্যকর হয় না। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সহায়তা, বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ফলে বাজারে তারল্যও বাড়ছে। তাই কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নীতি সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান নীতি সুদহার বহাল রাখাই বাস্তবসম্মত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানো শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে, কিন্তু বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে সেটি সহজ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অনেক উদ্যোক্তা মূলধন ও কার্যকর মূলধনের সংকটে রয়েছেন। তাঁদের ব্যবসা স্বাভাবিক করতে আর্থিক সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
তিনি বলেন, সরকারকে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাত থেকেও ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে একদিকে সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে, যা অবশ্যই উদ্বেগজনক। তবে শুধু মূল্যস্ফীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান—এই তিনটি লক্ষ্যকে সমন্বয় করেই নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির সামঞ্জস্যও বজায় রাখা হবে।