ঢাকা: প্রায় এক দশকের তদন্ত শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত রিজার্ভ চুরি মামলায় খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আইনি মতামতের জন্য ইতোমধ্যে খসড়া চার্জশিট অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির এই ঘটনায় দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট ও খসড়া অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পাওয়া ফরেনসিক তথ্য-প্রমাণ, ডিজিটাল আলামত এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতের বড় ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে দ্রুত অভিযোগপত্র গ্রহণ এবং বিচার কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। তাদের মতে, মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি হলে আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০১৬ সালের আলোচিত রিজার্ভ চুরি
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে অর্থ সরিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।
গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানেই তদন্তের কাজ শেষ হয়। পরে চলতি বছরের ১ এপ্রিল খসড়া অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
কোন্ দেশের কত অভিযুক্ত
খসড়া চার্জশিটে থাকা ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে- ফিলিপাইনের ৩৬ জন/প্রতিষ্ঠান;
বাংলাদেশের ১০ জন/প্রতিষ্ঠান;
শ্রীলঙ্কার ৮ জন/প্রতিষ্ঠান;
ভারতের ৪ জন;
চীনের ৩ জন;
উত্তর কোরিয়ার ২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ও
জাপানের ১ ব্যক্তি রয়েছে।
বাংলাদেশের যাদের নাম এসেছে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের বিভিন্ন গাফিলতি, ঘটনা গোপন রাখা এবং আলামত নষ্টের চেষ্টাসহ নানা বিষয়ে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য চাপ থাকলেও এবার চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম রাখা হয়েছে।
চার্জশিটে আরও রয়েছেন—
ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আনিস এ খান;
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কেএম আবদুল ওয়াদুদ;
সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম;
তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক;
সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহাসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ৯ কর্মকর্তা রয়েছে।
বিদেশি অভিযুক্তদের মধ্যে কারা
ফিলিপাইনের বিভিন্ন ব্যক্তি ছাড়াও দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, মিডাস ক্যাসিনো এবং সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর নাম রয়েছে।
ভারতের চার নাগরিক নীলাভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন, প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আত্রেশ ও রাকেশ আস্তানার নামও চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়োক এবং হ্যাকার সংগঠন লাজারাস গ্রুপকে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া চীনের তিন নাগরিক ও জাপানের এক নাগরিকের নাম রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার ৭ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
এফবিআই’র সহায়তায় শনাক্ত প্রধান অভিযুক্ত
২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ কবির জানান, ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়োক এবং তার নেতৃত্বাধীন লাজারাস গ্রুপকে শনাক্ত করতে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।
তিনি বলেন, এফবিআইয়ের বিশেষ এজেন্ট নাথান পি. শিলডের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিবেদন সংগ্রহ করে প্রধান অভিযুক্তদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে আরসিবিসি ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তদন্তে ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা
মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বর্তমান অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান জানান, চুরির ৪১ দিন পর মামলা দায়ের হওয়ায় প্রকৃত অপরাধস্থলে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। তার আগেই একটি বিদেশি আইটি প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকজন অননুমোদিত ব্যক্তি ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেছিলেন।
তার ভাষ্য, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশ-বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া দেগুইতোর জবানবন্দিও সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে তিনি একাধিক বিদেশি অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন।
শতভাগ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দাবি
মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, তদন্তের কোনো কাজ আর বাকি নেই। শতভাগ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইনি মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সিআইডি’র সাবেক প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহও বলেন, তদন্তকারী দল দীর্ঘ সময় ধরে দেশি-বিদেশি তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে এবং অভিযুক্তদের দায়-দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ ও তদারকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মামলার খসড়া অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইনি মতামত পাওয়ার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং এরপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে। তবে চূড়ান্ত অভিযোগপত্রে কী থাকে এবং বিচার শেষে আদালতের রায়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। এ মামলার নিষ্পত্তি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বস্তির জায়গায় পৌঁছাবে, কারণ ঘটনাটি প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির জন্য বড় ধরনের আঘাত ছিল।
ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা উল্লেখ করে আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা হিসেবে তিনিও এ ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার ভাষায়, ‘এ ধরনের ঘটনা আমাদের গৌরবময় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি যাতে গাফিলতি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার সাহস না পায়, সেজন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তারা দেশি বা বিদেশি—যেই হোক না কেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান তাদের বিপক্ষেই থাকবে। সাবেক কর্মকর্তা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি হলেও সবার ক্ষেত্রে একই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হবে। তাঁর মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক ও সুনামের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই দ্রুত, সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত বিচার সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রসঙ্গত, দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় অর্থপাচারের পথ, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে প্রায় এক দশক ধরে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এখন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরুর অপেক্ষা।