ঢাকা: ঋণগ্রহীতা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধের কারণে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার প্রদত্ত ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। ইতোপূর্বে প্রতি অর্থবছর শেষে যেখানে ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি বেড়েছে, এবার এর বিপরীত চিত্র ওঠে এসেছে।
সদ্য প্রকাশিত বাজেট উপাত্ত অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি ৫৬টি ঋণচুক্তির বিপরীতে সরকার প্রদত্ত ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৭২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৮২ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি কমেছে ৪৫ হাজার ৩৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বাজেট উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিসিআইসি কর্তৃক ইউরিয়া সার আমদানি, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন, বাংলাদেশ বিমানের জন্য বোয়িং ক্রয়, বিপিসি কর্তৃক জ্বালানি তেল আমদানি, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগেুলোকে চলতি মূলধন ঋণ প্রদান ও কৃষি ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থা দেশি-বিদেশি ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও দাতাসংস্থার কাছ থেকে গত ২০০৪ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব ঋণ নিয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে সরকারের নীতি ও কর্মসূচী বাস্তবায়নের স্বার্থে সরকারি মালিকানাধীন আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গৃহীত ঋণের জন্য গ্যারান্টি ও কাউন্টার গ্যারান্টি প্রদান করে থাকে সরকার। কোনো কারণে ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঋণ যথা সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে এগুলো পরিশোধের দায়-দায়িত্ব তখন সরকারের ওপর বর্তায়।
বাজেট উপাত্তে দেখা যায়, ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি কমলেও খাতওয়ারি হিসাবে ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানের শীর্ষে বরাবরের মত এখনো বিদ্যুৎ খাত। বিদায়ী অর্থবছরে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোকে চলতি মূলধন প্রদানে ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যাংক গ্যারান্টি কমেছে।
অর্থ বিভাগের হিসাব মতে, বিদ্যুৎ খাতের ১৫টি প্রকল্পের বিপরীতে বর্তমানে মোট পুঞ্জিভূত গ্যারান্টির স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৭০৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ১৮টি প্রকল্পের বিপরীতে এ খাতে মোট পুঞ্জিভূত গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ৫৩ হাজার ৭১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি কমেছে ১৮ হাজার ৩৬৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প ভিত্তিক গ্যারান্টি পর্যালোচনায় দেখা যায়, একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বেশি গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে ‘পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট’টিকে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ‘বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’। এ প্ল্যান্ট তৈরি জন্য ‘এক্সিম ব্যাংক অব চায়না’র কাছ থেকে গৃহীত ঋণের ৫০ ভাগের বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি প্রদান করেছে। বর্তমানে ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ১৪ হাজার ১৪০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। গত অর্থবছর শেষে এর স্থিতি ছিল ১৬ হাজার ১৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।
বিদ্যুতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে-‘রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড’ ও ‘নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড’ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘পটুয়াখালি ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র’। এ প্রকল্পের বিপরীতে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ১০ হাজার ১৫৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ‘এক্সিম ব্যাংক অব চায়না’র কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত অর্থবছর শেষে এর স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৭৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
ব্যাংক গ্যারান্টির দ্বিতীয় শীর্ষ তালিকায় রয়েছে ‘বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) কর্তৃক ইউরিয়া সার আমদানি। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বিসিআইসি’র অনুকূলে পুঞ্জিভূত গ্যারান্টির পরিমাণ দাঁড়াবে ৮ হাজার ৭৫৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে স্থিতি ছিল ৮ হাজার ৮৭৬ কোটি ৭ লাখ টাকা);
ব্যাংক গ্যারান্টির তৃতীয় স্থানে রয়েছে – ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা; (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ১০ হাজার ৬৩২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা);
অবশিষ্ট খাতগুলোর মধ্যে- পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসি’র অনুকূলে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ৬ হাজার ৭৮৬ টাকা; (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ৭ হাজার ৬৯৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা);
উড়োজাহাজ ক্রয়সহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশ বিমান-কে ১৫টি গ্যারান্টির বিপরীতে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি মোট ৬ হাজার ২৫৭ কোটি ২১ লাখ টাকা; (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ৭ হাজার ৭৪৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা);
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন-এর অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর চলতি মূলধন ঋণের বিপরীতে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ৩ হাজার ৯৬০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ১ হাজার ১১৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা);
কৃষি ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ২ হাজার ৮৯৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ৩ হাজার ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা);
বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণে কর্মসংস্থান ব্যাংকের অনুকূলে বাংলাদেশ ব্যাংককে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ২ হাজার ২৮১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ২ হাজার ১০২ কোটি ২০ লাখ টাকা);
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন প্রকল্পের বিপরীতে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ৪৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ৬৪০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা);
বিজেএমসি’র আওতাধীন ১৬টি জুট মিলের চলতি মূলধনের বিপরীতে বর্তমান ব্যাংক গ্যারান্টির স্থিতি ২৮৫ কোটি ৫ লাখ টাকা (গত অর্থবছর শেষে এ খাতে গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ৯০ কোটি ৭০ লাখ টাকা)।
এছাড়া গত বছরের বাজেট ডকুমেন্টে ছিল এমন চারটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক গ্যারান্টির তালিকামুক্ত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- বিএডিসি (গ্যারান্টির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা), টিসিবি (গ্যারান্টির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা) ; আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক (গ্যারান্টির পরিমাণ ছিল ৭৫০ কোটি টাকা) ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ৬৩১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।