ঢাকা: দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও আর্থিক অব্যবস্থাপনায় কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের মঙ্গলবারের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
অবসায়নের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই বহু বছর ধরে আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ, নতুন ঋণ বিতরণ বন্ধ এবং কার্যক্রম প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিক অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি স্বল্প সঞ্চয় এসব প্রতিষ্ঠানে রেখেছেন, তাদের ক্ষতি কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৪ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিতরণ করা প্রায় সব ঋণই আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে প্রণীত ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন’-এর আওতায় লাইসেন্স বাতিল ও অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আইন অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘসময় আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে এবং আর্থিক সক্ষমতা হারালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটিকে অবসায়নের আওতায় আনতে পারে।
বর্তমানে দেশে কার্যরত ৩৫টি এনবিএফআইয়ের মধ্যে অন্তত ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের প্রায় ৮৩ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের কারণে পুরো এনবিএফআই খাত দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে।
সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানত আটকে আছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জমা প্রায় ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে রয়েছে পিপলস লিজিংয়ে, যেখানে হাজারো আমানতকারী বছরের পর বছর ধরে অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় আছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অবসায়নের সিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। তবে শুধু অবসায়ন নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতে এনবিএফআই খাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা