ঢাকা: নিয়মিত দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হলেও বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঋণ বাড়ছেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সরকারের মোট (অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি) ঋণ বেড়েছে ৬২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। আর অর্থবছরের প্রথম (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রান্তিকে ঋণ বেড়েছিল মাত্র ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা। সে হিসাবে শুধু দ্বিতীয় (অক্টোবর-ডিসেম্বর) প্রান্তিকে ঋণ বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা।
তবে এ ঋণের পুরোটাই বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।
অতি সম্প্রতি এ হিসাব চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
অর্থ বিভাগ-এর হিসাব মতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বা ২০২৫ সালের জুন শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত (অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি) ঋণ স্থিতি ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) এর পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। জিডিপি’র হিসেবে এ ঋণের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
অর্থ বিভাগ-এর হিসাব মতে, সরকারের সার্বিক পুঞ্জিভূত ঋণের মধ্যে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এটি মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৫৭ শতাংশ এবং জিডিপি’র ২১ দশমিক ৫১ শতাংয়শ। আর মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। এটি মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৪৩ শতাংশ এবং জিডিপি’র ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। গত ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পুঞ্জিভূত স্থিতি ছিল মোট ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে ছয় মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৫৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা।
আর পুঞ্জিভূত ব্যাংক ঋণের মধ্যে ট্রেজারি বন্ড ও স্পেশাল ট্রেজারি বন্ড থেকে ৬ লাখ ৮ হাজার ২২৩ কোটি টাকা, ট্রেজারি বিল থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ২১৭ কোটি টাকা ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ও ‘সুকুক’ থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে গৃহীত পুঞ্জিভূত ঋণ স্থিতি সামান্য কমেছে। গত ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে সরকারের পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ১৯ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে এটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে এ খাতে পুঞ্জিভূত ঋণ কমেছে।
তবে ব্যাংক-বহির্ভূত খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি কমলেও গত জুলাই-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সঞ্চয়পত্র খাতে পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে এ খাতে পুঞ্জিভূত ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে এ খাতে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা।
বৈদেশিক ঋণ কত
সরকারের পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্য বিদ্যমান। এর পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগে-এর হিসাবে, গত ডিসেম্বর শেষে সরকারের পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।
আর বাংলাদেশ ব্যাংক-এর হিসাব মতে, গত ডিসেম্বর শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি হচ্ছে ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার ২৩১ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ-এর মতে, সরকারের ঋণ বাড়লেও এটি এখনো ঝুঁকিসীমার নীচে রয়েছে। বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে ‘নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে। তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ-রফতানি অনুপাত ১৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং রফতানির তুলনায় এর মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টি
অর্থ বিভাগ বলছে, সরকারের এ পুঞ্জিভূত ঋণ হিসাবের বাইরে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি গৃহীত ঋণের বিপরীতে সরকার প্রদত্ত সার্বভৌম গ্যারান্টি বা দায় রয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে এ ধরনের গ্যারান্টির স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৫৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৪৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। গত ২০২৫ সালের জুন শেষে সরকারের দেশি-বিদেশি মোট গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত ডিসেম্বর শেষে গ্যারান্টির পরিমাণ কমেছে।