এককালের দারিদ্র্যপীড়িত বন্দর নগরী থেকে চীনের সাংহাই এখন আধুনিক যুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নগর সাফল্যের গল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বদলে যাওয়া সাংহাইয়ে সুউচ্চ ভবন, উন্নত অবকাঠামো এবং যত্নসহকারে পরিকল্পিত গণপরিসর শুধু শহরের বাহ্যিক রূপই নয়, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শুধু তাই নয় এখন সাংহাইকে চীনের অবিসংবাদিত অর্থনৈতিক রাজধানী এবং পূর্ব চীনের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র (ইকোনমিক হাব) হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ এটি শুধুমাত্র চীনের বৃহত্তম নগর অর্থনীতিই নয়, বরং একটি শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র। সাংহাই বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর। জনসংখ্যা ২৬ মিলিয়নেরও বেশি হলেও সুনির্দিষ্ট নগর পরিকল্পনাই শহরটিকে বিদেশীদের কাছে একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছে।
চীনের নগরগুলোর মধ্যে সাংহাইয়ের জিডিপি সবচেয়ে শীর্ষে এবং এটি ২০২৪ সালে প্রায় ৫.৩৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ৭৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তবুও বিদেশীদের কাছে খালি চোখে শহরটিকে নির্জন মনে হবে, কারণ বেশিরভাগ মানুষ শহরের নীচে মেট্রোরেলে চলাচল করে। সেই কারণে ট্রাফিক জ্যামের ছিটেফোঁটাও নেই।
শহরটির অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। বর্তমানে সাংহাই বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম এবং সেরা সংযুক্ত কনটেইনার বন্দরের আবাসস্থল, যা বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের প্রধান কেন্দ্র। তেমনি রয়েছে অত্যাধুনিক স্টিল ফ্যাক্টরি বা ইস্পাত কারখানা, সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ, গ্লাস টাওয়ারের মতো বিনোদন কেন্দ্র। সবমিলিয়ে আজকের সাংহাই।
সাংহাই হয়ে ওঠার পেছনের গল্প
ইয়াংজি নদীর ব-দ্বীপ এবং পূর্ব চীন সাগরের মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় সাংহাই প্রাকৃতিকভাবেই ভৌগোলিক কৌশলগত সুবিধা ভোগ করেছে। সাংহাই বন্দর শহরটির অর্থনৈতিক সাফল্য প্রতিষ্ঠায় এর ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি শহরকে ঘিরে নগরবিদদের কঠোর পরিশ্রম ও পরিকল্পনাই অন্য শহর থেকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
তবে অন্যতম প্রধান কারণ অবশ্য ভৌগলিক। পূর্ব চীন সাগরের কাছে ইয়াংজি নদীর দক্ষিণ মোহনায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায়, শহরটি ঐতিহাসিকভাবে সম্পদ, প্রধান বাণিজ্য পথ এবং আন্তর্জাতিক জলপথে প্রবেশের সুবিধা পেয়েছে। বাণিজ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ইতিহাস বিশ্ব মঞ্চে সাংহাইয়ের প্রাধান্যকে সুদৃঢ় করেছে, যার অর্থ হলো, মাও-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কার অর্থনৈতিক মন্দার পরেও শহরটি দ্রুত একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে যখন চীন পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুনরায় শুরু করে, তখন সাংহাইয়ের ব্যবসা-বাণিজ্য আবারও চীনের অর্থনীতির অগ্রভাগে উঠে আসে এবং তখন থেকেই শহরটি সমৃদ্ধি লাভ করেছে।

সাংহাই, চীন। ছবি : সারাবাংলা
এছাড়াও বর্তমানে অতি উচ্চ সাংহাই ওয়ার্ল্ড ফিনান্সিয়াল সেন্টার গগনচুম্বী অট্টালিকাটি তৃতীয় শিল্পের মাধ্যমে শহরে আসা নতুন সম্পদের প্রতীক। চীনের ‘আরও পুঁজিবাদী’ বাণিজ্য পদ্ধতির দিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে চালিত করার জন্য উদ্দীপনামূলক উদ্যোগ হিসেবে পরিকল্পিত একাধিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। নবম ও দশম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯৬-২০০৫) সাংহাইয়ের তৃতীয় শিল্পের (সেবা খাত) দ্রুত বিকাশ ঘটে – যা শহরের জিডিপির ৫০ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। এটি শহরটির জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে, যা একটি ভোগবাদী সেবা অর্থনীতিকে মূলধারায় নিয়ে আসে।
১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে সাংহাইয়ের তৃতীয় অর্থনীতির বেশ কয়েকটি মূল ক্ষেত্র—অর্থনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা, খুচরা ব্যবসা, প্রযুক্তি এবং ব্যবসার প্রসার বেড়েছিল। চীনের অনেক আর্থিক সংস্কার প্রকল্প সাংহাইতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়ায়, শহরটি দ্রুত একটি চিত্তাকর্ষক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
শহরে তৃতীয় স্তরের শিল্পের প্রসার পর্যটন এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণের প্রতিও নতুন করে আগ্রহ জাগিয়েছে। ২০১৭ সালে ৩১৮ মিলিয়নেরও বেশি দেশীয় পর্যটক এবং ৮.৭ মিলিয়ন বিদেশী পর্যটক শহরটি পরিদর্শন করেন – যা এটিকে বিশ্বের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী পর্যটন শহরে পরিণত করেছে। ফলস্বরূপ সাংহাইতে সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যাও বাড়ছে, কারণ শহরটি আজ বিশ্বজুড়ে সেইসব পর্যটকদের চাহিদা পূরণ করছে যারা এই শহর এবং বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে তাদের আর্থিক বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
কী সেই মূলমন্ত্র
কঠোর ও জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাসকারী বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে শহরটির নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে শুরু করে। যা এখন সাংহাইকে দেখলেই অতীত মনে হয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে পিপলস স্কোয়ারে অবস্থিত সাংহাই আরবান প্ল্যানিং এক্সিবিশন সেন্টারের সুপরিকল্পিত নগরভাবনায়। প্রায়শই ‘শহরের জানালা’ হিসাবে পরিচিত ২০ হাজারের বর্গমিটারের এই কমপ্লেক্সটি কেবল তথ্য উপস্থাপনের চেয়েও বেশি কিছু করে; এটি রূপান্তরের একটি যত্নসহকারে নির্মিত গল্পকে তুলে ধরেছে।
ভবনটির বিভিন্ন তলা জুড়ে বড় বড় দেয়াল প্যানেল, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, টীকাযুক্ত মানচিত্র, বিভিন্ন যুগের প্রতিকৃতি এবং অত্যন্ত বিস্তারিত স্থাপত্য মডেলের মাধ্যমে সাংহাইয়ের বিবর্তন ফুটিয়ে তুলেছে।
এই উপাদানগুলো একত্রে দর্শকদের একটি দৃশ্যগত ও স্থানিক আখ্যানের মধ্য দিয়ে পথ শহরটির অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে মূর্ত ও পরস্পর সংযুক্ত করেছে। তবে এই শহর গড়ে তোলার পেছনে একটা দর্শন পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। শহরের বেশ কিছু স্থানে এই দর্শনের মন্ত্রটি মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এটি হল, মানুষই শহর গড়ে তোলে, এবং শহর মানুষের জন্যই বিদ্যমান।
সরেজমিনে আরবান প্ল্যানিং এক্সিবিশন সেন্টারের প্রদর্শনী কেন্দ্রটি ঘুরে দেখার পর স্পষ্ট মনে হয়েছে, সাংহাইয়ের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল কয়েক দশক ধরে চলা ধারাবাহিক ও কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনার ফল, কোনো অসংগঠিত বাজার শক্তির কারণে নয়।
কেন্দ্রটির একটি অংশে আর্কাইভের ছবি ও প্যানেল ব্যবহার করে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সাংহাইকে দারিদ্র্য ও ঘনবসতিপূর্ণ শ্রমিক-শ্রেণির বসতির শহর হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা আজকের বহুতল ভবন ও সবুজ এলাকার মডেলের সাথে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে এবং এক নজরে রূপান্তরের ব্যাপকতা প্রকাশ করে।
প্রদর্শনী কেন্দ্রটির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে আধুনিক সাংহাইয়ের একটি বিশাল স্কেল মডেল, যা একটি পুরো হল জুড়ে বিস্তৃত। এটি কেবল সজ্জাসামগ্রীই নয়, বরং কয়েক দশকের পরিকল্পনাকেও ধারণ করে। এর চারপাশের প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ‘সাংহাই ২০৩৫’ পর্যন্ত ধারাবাহিক মহাপরিকল্পনাগুলো কৌশলগত এবং ক্রমাগত পরিমার্জিত উপায়ে প্রবৃদ্ধিকে পরিচালিত করেছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য, যেখানে ঢাকার মতো শহরগুলো দ্রুত এবং প্রায়শই অপরিকল্পিত নগরায়নের চাপে হাঁসফাঁস করছে, সাংহাই কেবল প্রবৃদ্ধির গল্পের চেয়েও বেশি কিছু দেয়। এটি সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনায় প্রোথিত একটি স্বতন্ত্র মডেল উপস্থাপন করে, যা স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে মানব কল্যাণ, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলকে স্থান দেয়।
সাংহাইয়ের রূপান্তরের মূলে রয়েছে ‘মানবতাবাদী শহর’-এর ধারণা। এই ধারণাটি মানবতাবাদ সম্পর্কে চিরায়ত ইউরোপীয় ধারণা থেকে ভিন্ন। চীনা প্রেক্ষাপটে, এটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শিক কাঠামোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, যা সমষ্টিগত কল্যাণে উন্নয়নকে উৎসাহিত করে। এই দর্শনকে বিমূর্তভাবে উপস্থাপন করা হয়নি; প্রদর্শনীর দেয়াল জুড়ে প্রদর্শিত ডায়াগ্রাম, নীতির সময়রেখা এবং দৃশ্যমান কেস স্টাডির মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই পদ্ধতির অন্যতম সুস্পষ্ট প্রকাশ হলো ‘১৫-মিনিটের সামাজিক জীবনচক্র’। মানচিত্র এবং এলাকার বিন্যাসের মাধ্যমে চিত্রিত এই ধারণাটি দেখায় যে, বাসিন্দারা কীভাবে তাদের বাড়ি থেকে অল্প হাঁটাপথের মধ্যেই স্কুল, হাসপাতাল, দোকান এবং বিনোদন কেন্দ্রের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলো পাবে। এই দৃশ্যমান উপকরণগুলো দেখায় কীভাবে এই নীতিটি বিভিন্ন জেলায় প্রয়োগ করা হয়েছে, যা নগরে ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকারের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।
পরিবেশগত পরিকল্পনা সাংহাইয়ের কৌশলের আরেকটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। বড় বড় ডায়াগ্রাম এবং ইন্টারেক্টিভ ডিসপ্লেগুলো তুলে ধরে কীভাবে শহরটিকে একটি সবুজ ও পরিবেশগতভাবে স্থিতিস্থাপক নগর কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। মডেল এবং ডিজিটাল স্ক্রিনগুলো প্রচলিত শক্তির উৎস থেকে পরিচ্ছন্নতর বিকল্পের দিকে পরিবর্তনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, অন্যদিকে বিশদ প্যানেলগুলোতে স্বল্প-কার্বন সঞ্চালন ব্যবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।
একটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো “স্পঞ্জ সিটি” ধারণার উপস্থাপন। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা দেখতে পারেন, কীভাবে শহরের ভূগর্ভে বৃষ্টির পানি শোষিত, সঞ্চিত এবং পুনরায় ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিটিকে শুধুমাত্র বন্যার একটি প্রযুক্তিগত সমাধান হিসেবেই নয়, বরং একটি বৃহত্তর পরিবেশগত দর্শনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সাংহাইয়ের পরিকল্পনা মাটির নিচেও বিস্তৃত এবং এটি স্তরবিন্যস্ত মডেলের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে যা শহরের নিচের লুকানো অবকাঠামোকে উন্মোচন করে। মেট্রো লাইন, পরিষেবা, সংরক্ষণাগার এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থার জন্য বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীগুলো সাধারণত যা অদৃশ্য থাকে, তা দৃশ্যমান করে তোলে এবং শহরটি কীভাবে সতর্ক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জটিলতা সামাল দেয়, সে সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। বাংলাদেশের জন্য এবং বিশেষ করে ঢাকার জন্য, এই প্রদর্শনীগুলোতে নিহিত শিক্ষাগুলো সুস্পষ্ট এবং জোরালো।
প্রদর্শনীটি বারবার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরে এবং দেখায় যে কীভাবে সাংহাইয়ের উন্নয়ন কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত কৌশল দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। এর বিপরীতে, ঢাকার নগর বৃদ্ধি প্রায়শই খণ্ডিত বলে মনে হয়, যা একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদী চাপ দ্বারা প্রভাবিত। ‘১৫-মিনিটের শহর’ ধারণাটি ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজটের একটি বাস্তবসম্মত সমাধান প্রদান করে। অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রতিদিনের দূরপাল্লার ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা কমানো যেতে পারে। একইভাবে, “স্পঞ্জ সিটি” পদ্ধতির মডেলগুলো বর্ষার বন্যায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশে জলাবদ্ধতা মোকাবেলার জন্য একটি সম্ভাব্য কাঠামো প্রদান করে।
মানচিত্র ও পরিকল্পনা রেখাচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত সবুজ স্থানের উপর গুরুত্বারোপেরও গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। সাংহাই পার্ক ও প্রাকৃতিক এলাকায় প্রবেশাধিকারকে নগর জীবনের একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের শহরগুলিতে এই ধরনের স্থানের সম্প্রসারণ পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং জনস্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রদর্শনীটি তুলনামূলক চিত্র এবং স্থানিক মডেলের মাধ্যমে দেখায়, কীভাবে সাংহাই তার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে দ্রুত আধুনিকায়নশীল ভূদৃশ্যের সাথে একীভূত করেছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকরী দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে, যেখানে দ্রুত নগরায়নের কারণে ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো প্রায়শই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর শিক্ষণীয় বিষয়টি স্পষ্ট: সাংহাইয়ের এই ‘অলৌকিকতা’ কোনো ভাগ্য বা বাজারশক্তির ফল নয়, বরং এটি এমন এক সুক্ষ্ম, বহু-দশকব্যাপী পরিকল্পনার ফল যা শহরটিকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে। প্রদর্শনীটি যেমন সতর্ক করে, এই ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া কোনো সভ্যতাই প্রকৃত অর্থে উন্নতি করতে পারে না।
যদি কোনো দর্শনার্থী সাংহাইয়ের রাস্তায় হেঁটে যান, তবে তিনি প্রতিটি রাস্তার দুই পাশে রাস্তা, ভবন এবং সর্বোপরি গাছের জ্যামিতিক রেখা ও আকৃতি দেখতে পাবেন। এমন কোনো জমি নেই যেখানে সবুজ গাছ ও ফুল নেই, যা একজন মানুষকে ক্লান্ত করবে না। এখানকার মানুষের জন্য পুরো শহরটি যেন এক অক্সিজেনের প্রকোষ্ঠ।
শহরের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে দর্শনার্থীরা সাংহাইয়ের এক ঐকতান ও ছন্দ খুঁজে পাবেন। ভবনগুলো পরিমিত প্রতিসাম্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে; রাস্তাগুলো জ্যামিতিক রেখায় একে অপরের সাথে সংযুক্ত। দেয়ালে, মডেলে এবং ডিজিটাল ইনস্টলেশনে যত্নসহকারে সাজানো প্রদর্শনীর মাধ্যমে এটি একটি ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে: সুচিন্তিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী সমন্বয় এবং জনকল্যাণের প্রতি সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের মাধ্যমে নগরীর সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
শহরের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে দর্শনার্থীরা সাংহাইয়ের এক ঐকতান ও ছন্দ খুঁজে পাবেন। ভবনগুলো পরিমিত প্রতিসাম্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে; রাস্তাগুলো জ্যামিতিক রেখায় একে অপরের সাথে সংযুক্ত।
প্রতিটি রাস্তার দু’পাশে গাছের সারি ধৈর্যশীল অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বিচিত্র রঙের ফুলের গুচ্ছ সাধারণ ফুটপাতকে প্রায় প্রশান্তিদায়ক করে তুলেছে। জমির প্রতিটি ফালি যেন কোনো না কোনো সবুজের ছায়ায় ছেয়ে গেছে, যেন শহরটি তার মানুষের সাথে শ্বাস নেওয়ার এক সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে সাংহাইকে প্রকৃতির উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো শহর বলে মনে হয় না। বরং মনে হয়েছে, শহরটি পরিকল্পিত, যেন সময়ের সাথে বোঝাপড়া করে গড়ে উঠেছে। হ্যাঁ, ইস্পাত আর কাঁচের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেগুলো অন্য সবকিছুকে আড়াল করে দেয় না। রাস্তার দুপাশে গাছপালা, শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে নদী, আর কোনোভাবে এই সবকিছু কোনো রকম ঘর্ষণ ছাড়াই একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এই ভারসাম্য ইচ্ছাকৃত। আপনি অনুভব করতে পারবেন যে এখানকার কোনো কিছুই পুরোপুরি আকস্মিক নয়।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য প্রশ্নটি সাংহাইকে মডেল হিসেবে নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেটা থেকে শেখারও আছে। কারণ বাংলাদেশেও বহু নদী আছে, আছে নদীর পাড়ে শহর। কিন্তু নাই পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা। একটু সদিচ্ছা এনে দিতে পারে সাফল্য। আমাদের সাংহাইয়ের মতো হওয়ার দরকার নাই, আমরা বাস্তবতায় আমাদের নগর ও শহরগুলোকে গড়ে তুলতে চাই। তাতেই প্রকৃতির ভারসাম্যের পাশাপাশি উন্নয়ন সম্ভব।