নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার আশঙ্কাকে সামনে রেখে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গতকাল শনিবারের (২১ মার্চ) হুমকির জবাবে তেহরানের এই কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
রোববার (২২ মার্চ) ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণরূপে’ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো আক্রান্ত হলে শুধু প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না তেহরান। বরং ইসরায়েলের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি স্থাপনাগুলোর ওপর ‘ব্যাপক হামলা’ চালানো হবে। একই সঙ্গে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সম্পৃক্ত কোম্পানি ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণায় স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান করিডর। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানের কারণে ইতোমধ্যেই প্রণালিটি কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। তেহরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে—যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে।
ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, হামলা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করতে পারবে না। এমনকি পার হওয়ার চেষ্টা করলে হামলারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনে নিযুক্ত ইরানি প্রতিনিধি আলী মুসাভি জানিয়েছেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ সাপেক্ষে প্রণালিটি উন্মুক্ত থাকলেও ‘শত্রু’ দেশগুলোর জাহাজ এর আওতার বাইরে থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়াই নয়, বরং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে চাইছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে প্রণালিটি সচল রাখতে ন্যাটো মিত্রদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে অধিকাংশ দেশ এখনো সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততায় অনাগ্রহ দেখিয়েছে। যদিও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও জাপান যৌথভাবে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, বাস্তবে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত অবস্থান একযোগে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির জবাবে তেহরানের এই পালটা বার্তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর অনিশ্চয়তা তৈরী হয়েছে।