ঢাকা: দেশের মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নারীদের অবদান ব্যাপক হলেও তাদের অনেক সময় যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। মৎস্যজীবী পরিবারে নারীরা মাছ ধরা, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সরকারি পরিচয়পত্র বা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নাম প্রায়ই বাদ পড়ে বলে অভিযোগ করেন নারী নেত্রী ফরিদা আকতার।
শনিবার (৭ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও নারী সংহতির ২১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
ফরিদা আকতার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জেলে কার্ড বা খামারি হিসেবে নিবন্ধনের সময় নারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তারা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
তিনি বলেন, সমাজে নারীদের এক ধরনের অদৃশ্য করে রাখার প্রবণতা রয়েছে। বিভিন্ন কমিটি বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রায়ই বলা হয়—‘নারী পাওয়া যায় না’। কিন্তু বাস্তবে নারীরা বিভিন্ন খাতে কাজ করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাঁদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।
তিনি একটি জনসভার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এক অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার পুরুষের পাশাপাশি মাত্র এক হাজার নারীকে উপস্থিত করা সম্ভব হয়েছিল। শুরুতে নারীরা করতালি দিতেও সংকোচ বোধ করছিলেন, যা সমাজে নারীদের আত্মবিশ্বাস ও অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক আলোচনায় নারীদের পোশাক নিয়েও বিভাজন তৈরির চেষ্টা হয়েছে মন্তব্য করে ফরিদা আকতার বলেন, বোরকা বা পর্দা পরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়, কিন্তু নারীদের মুখ ঢেকে রাখার মতো চরমপন্থী ধারণা সমাজে নারীর উপস্থিতিকে মুছে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি করে।
রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই কমিশন গঠনের জন্য তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে কমিশন গঠনের পর সদস্যদের বিভিন্নভাবে অপমান ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আলোচনায় শেষ পর্যন্ত এই নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ফরিদা আকতার সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।
তার মতে, শুধু নারী দিবস উদযাপন নয়— নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন নারী নেত্রীও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেন। তারা বলেন, সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ৩৩ শতাংশ আসন নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
নির্বাচনী ইশতেহারেও নারীদের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তুলে ধরার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ‘মা-বোন’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।
বক্তারা মনে করেন, ধর্ষণের সংজ্ঞায় ‘সম্মতি’ বা কনসেন্টকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। নারীর পরিচয় বিবাহিত বা অবিবাহিত যাই হোক না কেন, তাঁর সম্মতি ছাড়া কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য আইন সংস্কারের দাবি জানান তারা।