গাইবান্ধা: গাইবান্ধার গ্রামীণ মাঠের প্রতিটি ফসলের গল্পে যেন আছে কৃষকের হাতের ছোঁয়া। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সব ধরণের সহজতা নিয়ে আসলেও, এখনও আছেন সেই মানুষ, যিনি অতীতের চিরচেনা পদ্ধতিকে হারতে দেননি। ৪০ বছর ধরে লাঙ্গল-জোয়াল ও গরুর সঙ্গে নিজের জমিতে হালচাষ করে আসছেন মঞ্জুর রহমান।
সম্প্রতি সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর গ্রামের কৃষক মঞ্জুরের সঙ্গে জমি চাষরত অবস্থায় মাঠে দেখা হলে কাজের ফাঁকে তার দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময়ের কৃষি জীবনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। দীর্ঘ এই সময়ে দেশের কৃষিতে যান্ত্রিক বিপ্লব হলেও আপাদমস্তক কৃষক মঞ্জুর জমি চাষে এখনো সনাতনী পদ্ধতি ব্যবহার করে ধান, পাট, আলুসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করছেন।
মঞ্জুর রহমান জানান, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চাকরির চেষ্টা না করে কৃষিকে আপন করে নিয়েছি। আমার দুটো গরুই আমার সহকর্মী। বছরের পর বছর এদের সঙ্গে কাজ করে আমার জীবনের অনেক আনন্দ এবং শৃঙ্খলা এসেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি সব কিছু সহজ করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে অনুভূতি, যে নিয়ম-শৃঙ্খলা লাঙ্গল-জোয়ালে থাকে, সেটা কোথাও পাওয়া যায় না।
পুরনো দিনের হালচাষের রীতি অনুযায়ী মঞ্জুর রহমানের দিন শুরু হয় ভোররাতেই। কাকাডাকা, সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে গ্রামের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে গরুর হুট-হাট, লাঙ্গলের ফলা মাটির সঙ্গে ঘষা খায়। তিনি বলেন, প্রতিটি দিন আমাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। গরুর পায়ের তোলা মাটি, লাঙ্গলের কাজ, জমির গোটা রূপ সবকিছুই আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
মঞ্জুর রহমানের মতে, গরু দিয়ে হালচাষ শুধুই ফসলের জন্য নয়, এটি মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা বজায় রাখে। লাঙ্গলের ফলা মাটি আলগা করে, ঘাস কমায়, এবং গরুর গোবর জমিতে পড়ে জৈব সার সরবরাহ করে। ফলে ফসল ভালো হয়, জমি দীর্ঘদিন উর্বর থাকে।
মঞ্জুর রহমান স্বীকার করেন, পাওয়ার টিলার, ট্র্যাক্টর সবই দ্রুত কাজ শেষ করে দেয়, কিন্তু গরু ও লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষের আনন্দ, মাটির সাথে সম্পর্ক, সেই অনুভূতি পাওয়া যায় না। তাই আমি এখনও এই পদ্ধতিতে আছি।
তার এই দৃঢ়তা শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি গ্রামের এক ধরণের সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণের প্রতীক। দিনের পর দিন কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকলেও, মঞ্জুর রহমানের মতো কৃষকরা প্রমাণ করে যে, লাঙ্গল-জোয়ালের সঙ্গে জমির প্রেমের কোনো বিকল্প নেই।
মঞ্জুর রহমান বলেন, ভোরের হালচাষের সময় আমরা ছোট ছোট গল্প বলতাম, একে অপরের সঙ্গে পরামর্শ হতো। বাড়ি থেকে পাঠানো পান্তা, সরিষার তেল, ভর্তা সবই ছিল হালচাষের অনন্য স্মৃতি।
এই চিরচেনা পদ্ধতি হারিয়ে গেলে শুধু কৃষি পদ্ধতি নয়, আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিও হারাবে।