Saturday 07 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নিষিদ্ধ জালের অদৃশ্য ফাঁস, মাছের মজুত কমেছে ৭৮ শতাংশ

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ মার্চ ২০২৬ ০৮:০৮ | আপডেট: ৭ মার্চ ২০২৬ ১০:২৬

নিষিদ্ধ জালের অদৃশ্য ফাঁস। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার: নাজিরারটেক থেকে শাহপরীর দ্বীপ। কক্সবাজারের প্রায় ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল একসময় ছিল মাছের প্রাচুর্যের প্রতীক। মাছে পূর্ণ ছিল মহেশখালী, কুতুবদিয়া উপকূল। গভীর সমুদ্র, মোহনা, নদী আর চ্যানেলজুড়ে মিলত টেংরা, বাটা, লইট্টা, চিংড়ি, রূপচাঁদা, ইলিশ, কোরালসহ নানা প্রজাতির মাছ। সেই উপকূলেই এখন জেলেদের জালে মাছের আকাল। এতে সরবরাহ কমে গেছে আড়তে। অন্যদিকে কিছুদিন পরপর সৈকতে ভেসে আসছে মৃত মা কাছিম ও বিপুল সংখ্যক জেলিফিশ, যা বিশেষজ্ঞদের চোখে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

এদিকে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে শত শত কোটি টাকার নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হলেও বাস্তবে মাছের আকাল কাটছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহার, অতিমাত্রায় ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের মাছের প্রজননচক্র ভেঙে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য- এমনকি জনস্বাস্থ্যের ওপরও।

বিজ্ঞাপন

ভোরের ফিশারি ঘাটে হতাশার ছবি

ভোর সাড়ে ৫টা। কক্সবাজার ফিশারি ঘাটে আলো ফুটতে শুরু করেছে। সমুদ্রফেরত ট্রলারগুলো একে একে ভিড়ছে। কাঁধে মাছের বাক্স, মাথায় ঝুড়ি। ব্যস্ত শ্রমিকেরা। কিন্তু সেই চিরচেনা কর্মচাঞ্চল্যের মাঝেও চাপা হতাশা স্পষ্ট। জেলে এরফানুল ইসলাম সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আগে জাল টানলে ভারে নড়ত না। এখন জাল তুলতে ভয় লাগে। প্রায়সময় খালি আসে।’

ট্রলারের মাঝি আবু ছৈয়দ জানালেন, একসময় এক ট্রিপে ২৫-৩০ মণ মাছ পাওয়া যেত। এখন তা অর্ধেকের নিচে নেমেছে। তেলের দাম, শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে, কিন্তু মাছ নেই। জাল বদলাতে গিয়ে অনেকে নিষিদ্ধ জালে ঝুঁকছেন। যা আবার অভিযানে জব্দ হচ্ছে। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সমস্যার শিকড়ে কি পৌঁছানো যাচ্ছে?

অভিযানে শত কোটি টাকার জাল জব্দ

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী উপকূলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, মৎস্য অধিদফতর ও জেলা প্রশাসন শতাধিক অভিযান চালায়।

নৌবাহিনীর বিশেষ কম্বিং অপারেশনের ৩০৩টি অভিযানে জব্দ করা হয় প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ ৬৫ হাজার ৮০০ মিটার অবৈধ জাল, ৫৪২টি নিষিদ্ধ জাল এবং বিপুল পরিমাণ জাটকা। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, এসবের আনুমানিক মূল্য ১৩২ কোটি টাকার বেশি। পৃথক অভিযানে ১৫৭ কোটি, ১৭২ কোটি ও ১৯৩ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জাল ও মাছ জব্দের তথ্য রয়েছে।

কোস্ট গার্ডের এক অভিযানে ৭০ লাখ মিটার বিদেশি কারেন্ট জাল (মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা) এবং মহেশখালীতে ৫০ লাখ মিটার চরঘেরা জাল (মূল্য আনুমানিক ৭৫ কোটি টাকা) উদ্ধার করা হয়। কাগজে-কলমে এই অংক বিশাল হলেও উপকূলের বাস্তবতা বলছে, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার থামেনি।

সমুদ্রে আর্টিসানাল ট্রলিংয়ের দৌরাত্ম্য

আর্টিসানাল ট্রলিং বোট এখন উপকূলের আরেক বড় আতঙ্ক। কাঠের ছোট নৌকায় শক্তিশালী ইঞ্জিন বসিয়ে ছোট ফাঁসের বেহুন্দি জাল ব্যবহার করে অগভীর ও গভীর দুই জায়গাতেই মাছ ধরা হচ্ছে। এতে রেণু পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এমনকি মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যও ধরা পড়ে।

চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেই কোস্ট গার্ড একাধিক অভিযানে এসব বোট আটক করেছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি গভীর সমুদ্রে কোস্ট গার্ড জাহাজ জয় বাংলার অভিযানে দুটি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোট, ১২টি ট্রলিং জাল (মূল্য প্রায় ৩১ লাখ টাকা) ও প্রায় এক হাজার কেজি মাছ জব্দ হয়। আটক হন ৩৪ জেলে। এর আগে ১১ জানুয়ারি ও ২ জানুয়ারি ইনানী উপকূলেও পৃথক অভিযানে বোট, জাল ও হাজার হাজার কেজি মাছ জব্দ করা হয়।

প্রতিদিন ধ্বংস কোটি প্রাণ

টেকনাফের বাহারছড়া, শামলাপুর, শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় জোয়ারের সময় সমুদ্রে তাকালে মনে হয় নীল পর্দা ঝুলছে। এগুলো মশারি জাল। চিংড়ি পোনা ধরার সবচেয়ে ক্ষতিকর উপায়।

স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, উপকূলে অন্তত ১২ হাজার মশারি জাল সক্রিয়। প্রতিদিন ধরা পড়ছে প্রায় ৫৫ লাখ চিংড়ি পোনা। কিন্তু একটি পোনা ধরতে গিয়ে মারা যাচ্ছে ৬০-৭০টি অন্য প্রজাতির পোনা ও লার্ভা। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি জলজ প্রাণ ধ্বংস হচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার সারাবাংলাকে বলেন, ‘চিংড়ি পোনা আহরণ শুধু একটি প্রজাতির ক্ষতি নয়, এটি পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে দেয়।’

মা কাছিমের নিঃশব্দ মৃত্যু

কক্সবাজার সৈকত অলিভ রিডলে কাছিমের ডিম পাড়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ১০০ এর বেশি মৃত কাছিম সৈকতে ভেসে এসেছে। অধিকাংশের পেটেই ছিল ডিম।

নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) জানায়, এক দশক আগে যেখানে ৫২টি পয়েন্টে মা কাছিম ডিম পাড়ত, এখন তা কমে ৩৪টিতে নেমেছে। পরিবেশবিদদের মতে, কারেন্ট ও বেহুন্দি জালেই সবচেয়ে বেশি কাছিম আটকা পড়ে।

প্রকৃতির সতর্কবার্তা জেলিফিশের ঢল

গত তিন মাসে কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, হিমছড়ি ও ইনানী সৈকতে দেড় হাজারের বেশি জেলিফিশ ভেসে এসেছে বলে জানিয়েছে ইয়ুথ এনভায়রমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া।

বাংলাদেশ মহাসাগর গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। নরমদেহী প্রাণী জেলিফিশ উষ্ণ ও কম অক্সিজেনযুক্ত পানিতে টিকে থাকতে না পেরে তীরে ভেসে আসছে।

সুনীল অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধনিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছিল, সাম্প্রতিক এক সরকারি-আন্তর্জাতিক জরিপ সেই আশাবাদে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অরগনাইজেশন ও নরওয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ইএএফ নানসেন সার্ভে-২০২৫-এ উঠে এসেছে আশঙ্কাজনক চিত্র।

জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর গত সাত বছরে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মাছের মজুত কমেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে স্মল পেলাজিক মাছের মজুত ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন। যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮১১ টনে। সার্ডিন, ইলিশ, ছুরি, হার্ড টেইল, ম্যাকারেল, পোয়া ও আইলাসহ অন্তত ৬০ প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য কমে গেছে।

প্রায় ৩২ দিনের এই জরিপে ২৬ সদস্যের গবেষক দল বাংলাদেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের ৬৮টি স্টেশন থেকে সমুদ্রবিজ্ঞান, ট্রলিং, প্ল্যাংকটন, জেলিফিশ ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের তথ্য সংগ্রহ করেন। জরিপে অতিমাত্রায় মাছ আহরণ, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত শিকার, ক্ষতিকর জাল, জলবায়ু পরিবর্তন, কীটনাশকের প্রভাব এবং পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের স্বল্পতাকে মাছের মজুত হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মৎস্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন সারাবাংলাকে জানান, দেশে বর্তমানে মাছ শিকারের ২৭৩টি বাণিজ্যিক ট্রলার রয়েছে, যা এক দশক আগেও ছিল না। এ অবস্থায় ধাপে ধাপে ট্রলারের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সদ্য বিদায়ী উপদেষ্টা ফরিদা আক্তারও বলেছেন, ‘অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ জাল ও ইকো সাউন্ডারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।’

যদিও এই জরিপে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় স্কিপজ্যাক টুনাসহ বিভিন্ন টুনা প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে এবং নতুন ৬৫ প্রজাতির মাছের সন্ধান মিলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এসব ইতিবাচক দিক সামগ্রিক সংকটকে আড়াল করতে পারছে না।

যা করণীয়

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক জাহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুধু জাল জব্দ করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দরকার সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ। নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন ও বিপণনে কঠোর ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর সমুদ্র নজরদারি, ক্ষুদ্র জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও প্রণোদনা, বৈজ্ঞানিক জরিপভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানো কঠিন। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ ও অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণ করে অন্তত সামুদ্রিক প্রাণীদের টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘কক্সবাজারের সাগর শুধু পর্যটনের নয়। এটি হাজারো পরিবারের জীবিকা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ। নিষিদ্ধ জালের এই অদৃশ্য ফাঁস যদি এখনই কাটা না যায়, তবে একদিন হয়তো এই সাগরের প্রাচুর্য থাকবে শুধু গল্পে। আর ভোরের ফিশারি ঘাটে জেলেদের দীর্ঘশ্বাসই হবে হারিয়ে যাওয়া সম্পদের নীরব সাক্ষ্য।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর