ঢাকা: নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আস্থা ফিরিয়ে আনা। নতুন সরকারের সামনে তাই সময় কম, কাজ বেশি। এখন নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে। আর অর্থনীতিকে শুধু স্বাভাবিক গতিতে ফেরানো নয় বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক নতুন বাস্তবতায় প্রস্তুত করাই এখন সরকারের বড় দায়িত্ব।
বুধবার (৪ মার্চ) ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকে নজর: স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে নবনির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতা তুলে ধরে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। ইংরেজী জাতীয় দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ও এ আয়োজনের একজন অংশীদার। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি এখন ভাঙনের মুখে নয়, কিন্তু চাপের বৃত্তে আটকে আছে। সঠিক সময়ে সঠিক সংস্কার হলে পুনরুদ্ধারের যে আভাস দেখা যাচ্ছে, তা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা— সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অস্বস্তিকর পর্যায়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা স্পষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রভাব। সামনে আবার এলডিসি উত্তরণ। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা যদি নীতির ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা না পান, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগোবেন না। একইভাবে সাধারণ মানুষ যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তাহলে ভোগব্যয়ও সীমিত থাকবে। তাই মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সিপিডি বলেছে, ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী ধারা কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরের গতি কমে যাওয়ার প্রতিফলন। শিল্প খাতে উৎপাদন সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি, সেবা খাতে ভোগব্যয় কমেছে এবং বিনিয়োগের নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা দেখা গেছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে ওঠায় বোঝা যায় যে অর্থনীতি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্নভিত্তি প্রভাব ও কিছু পুনরুদ্ধার মিলিয়ে একটি সাময়িক গতি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই গতি কি টেকসই হবে, নাকি আবারও মন্থর হয়ে পড়বে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির চিত্রও একইভাবে দ্বৈত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কিছুটা কমায় এই হার নেমেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চসীমার কাছাকাছি। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে মানুষের প্রত্যাশাও বদলে যায়, বাজারে দাম স্থিতিশীল হলেও ভোক্তার আস্থা সহজে ফেরে না। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১২ শতাংশে আটকে আছে। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে সামান্য ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে পরিবারের সঞ্চয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ভোগব্যয় চাপে পড়লে শিল্প ও সেবা খাতও তার প্রভাব অনুভব করে। ফলে মূল্যস্ফীতি কেবল সামাজিক চাপ নয়, প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
সিপিডি বলেছে, রাজস্ব পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমেছে। এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানের তুলনায় অত্যন্ত নিম্ন। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতও কমেছে, ফলে উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে যেতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় ও বৈদেশিক দুই ধরনের ঋণই বেড়েছে। যদিও এখনো ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, তবে সুদের বোঝা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেটে ব্যয় সংকোচনের চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে পৌঁছানো ইঙ্গিত দেয় যে প্রশাসনিক উদ্যোগে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এই গতি ধরে রাখতে হলে করের আওতা বাড়ানো, ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি।