চট্টগ্রাম: প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটে বড় ধরনের দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে এবং এটি সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা বিবর্জিত ও উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এমপি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বড় বাজেট মানেই বড় দুর্নীতি করার সুযোগ তৈরি হওয়া। বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে দলীয় এমপিরা বরাদ্দ পেলেও সেখানে কোনো স্বচ্ছতা বা জবাবদিহি নেই। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ঋণ খেলাপিদের টাকা ফেরত নেওয়া, আওয়ামী আমলের লুটেরা ও পাচারকৃত টাকা আদায় এবং বিচারের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই।’
শুক্রবার (১২ জুন) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে এবং প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা বর্তমান কর কাঠামো ও প্রশাসনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত রাজস্ব কখনোই আদায় হয়নি এবং সর্বশেষ বাজেটেও যেখানে মাত্র ৩ লাখ কোটির কিছু বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে, সেখানে এক বছরের মাথায় তা দ্বিগুণ করা অসম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘বাজেটের পূর্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে একটি ছায়া বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল যা সরকারকে সহায়তা করতে পারত। রাজনৈতিক সংস্কারের পর অর্থনৈতিক সংস্কারের আশা করা হলেও এই বাজেটের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়।’ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং কিছু পণ্যের কর কমানো ইতিবাচক হলেও দেশে নজিরবিহীন দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে না।
নাহিদ বলেন, ‘এস আলমসহ বড় বড় মাফিয়ারা জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে থাকলেও তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো বক্তব্য বাজেটে পাওয়া যায়নি; উল্টো ইসলামী ব্যাংককে আবার এস আলমের হাতে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’ এছাড়া, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আদ্-দীন হাসপাতাল বন্ধ করে জামায়াত বা ১১ দলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি দেশের অর্থনীতির তিনটি মৌলিক সমস্যা ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অসম চুক্তি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট উল্লেখ করে বলেন, ‘বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় বাজেটে অনুপস্থিত। এই সামগ্রিক ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দিশা দেখানোর মতো কোনো বাজেট এটি হয়নি।’
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, তারা নিষিদ্ধ রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচারের মাধ্যমে দলগতভাবে তাদের বিচার করা হবে। সংসদে এটা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।’ প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবং মিডিয়াতে তাদের উসকানিমূলক প্রচারণা চালানো হলে তা আইন লঙ্ঘন হবে এবং সরকার ও প্রশাসন তা দেখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রামের স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং বৃষ্টি হলেই নগরবাসী ভোগান্তিতে পড়ে।’ এই সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। এর আগে তিনি চট্টগ্রামের ষোলশহরের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন দায়েম নাজির জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন।
এসময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জামেয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, তা সমগ্র জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। অতীতে ও বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এই প্রতিষ্ঠান ও সুন্নীয়তকে রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তাই তিনি আহ্বান জানান যেন জামেয়া মাদরাসা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তার নিজস্ব ঐতিহ্য, আদর্শ ও স্বকীয়তা বজায় রেখে একটি স্বাধীন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুন্নীয়তের আদর্শ ও আউলিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকার ধারণ করে সমগ্র জাতির কল্যাণে পথনির্দেশনা দেয়।