রাজশাহী: বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘যেসব স্বপ্নবাজ তরুণদের আত্মত্যাগের ফলে কেউ মন্ত্রী, কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু আপনারা কৃতজ্ঞ না থেকে বিগত স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, আপনারাও সেই পথেই হাঁটছেন।’
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যজোট আয়োজিত সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনে তরুণরা ভয়কে জয় করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল। বিগত ১৭ বছর আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন করেছি, কিন্তু দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত তরুণদের রক্ত ও আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। এখন সেই তরুণদেরই “শিশু সংগঠন” বা “গুপ্ত সংগঠন” বলা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’’
তিনি বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—জনগণের ৭০ শতাংশ রায়কে সম্মান করুন। জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, যদি জনগণের পক্ষে কাজ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তার জবাব দেবে। এখনো সময় আছে—এসে জনগণকে বলুন যে আপনারা জনগণের রায় মেনে নিচ্ছেন। জনগণ উদার; তারা আপনাকে ক্ষমা করবে।”
ডা. শফিকুর বলেন, আপনারা নির্বাচনি ইশতেহারে বলেছিলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ ক্ষমতায় বসতে পারবে না। অথচ নির্বাচন ছাড়াই এখন দেশের ৪৭টি জেলায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক বসানো হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম একটি গুম কমিশন গঠন করা হোক, যাতে অতীতের অন্যায়গুলোর বিচার হয়। তাতেও আপনারা কর্ণপাত করেননি।
তিনি আরও বলেন, “আমরা ভালো কাজের পক্ষে সবসময় পানির মতো তরল থাকব, কিন্তু অন্যায় দেখলে ইস্পাতের মতো কঠিন হব। আপনারা বলেছিলেন চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়বেন, অথচ এখন ক্ষমতায় এসে বলছেন, সমঝোতার মাধ্যমে নেওয়া টাকা চাঁদাবাজি নয়। একসময় আপনাদের দলের নাম ছিল ‘জাতীয়তাবাদী দল’, এখন মানুষ বলছে সেটি ‘চাঁদাবাজ দল’।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে। জাতীয় সংসদে যদি সত্য কথা বলার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে আমরা জনগণের মাঝে গিয়ে কথা বলব—যেখানে কোনো স্পিকারের অনুমতি লাগে না। কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না।
তিনি বলেন, “অনেক সময় আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যে সংগঠনের নেতাকর্মীরা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও হাসিমুখে জীবন দিতে পারে, তাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সম্মান করি, কিন্তু কেউ যদি আমাদের চোখ রাঙায়, সেটি মেনে নেওয়া হবে না। বাংলাদেশের মানুষের শান্তি নষ্ট করা হলে জনগণও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।”
সবশেষে তিনি বলেন, আজ পদ্মা ও তিস্তা নদীর বিশাল অংশ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। আমরা চাই নদীগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাক। খাল কাটার কর্মসূচি ভালো উদ্যোগ, তবে নদীতে পানি না থাকলে খাল খননের সুফল পাওয়া যাবে না। আমরা সবসময় ভালো কাজের পক্ষে থাকব, কিন্তু অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করব। আমাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। যারা চাঁদাবাজি করতে আসবে, জনগণ তাদের উপযুক্ত জবাব দেবে। আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু দেশের সম্মান কখনও বিসর্জন দেব না।
রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এমপি। এসময় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আব্দুল খালেক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবু জার গিফারী, বগুড়া মহানগরীর আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল, এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন, জয়পুরহাট জেলার আমির মো. ফজলুর রহমান সাঈদ এমপি, এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরা শারমিন, পাবনা জেলার আমির অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল এমপি, রাজশাহী মহানগরীর আমির ড. মো. কেরামত আলী এমপি, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম, খেলাফত মজলিশর নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম প্রমুখ।