‘মাটির ভেতর গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। দেয়ালগুলো নড়ছিল, আর আমার মনে হচ্ছিল যেন আমি পানির মধ্যে আছি’- বলছিলেন কারাকাস থেকে বেঁচে ফেরা আম্পারো দিয়াজ। তিনি সিএনএন এন এস্পানিওলকে (স্প্যানিশ ভাষার সংবাদ বিভাগ) বলেন, প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানার সময় তিনি গর্জন অনুভব করেছিলেন।
দিয়াজ বলেন, তিনি সে সময় তার চারতলা অ্যাপার্টমেন্টের মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রার্থনা করছিলেন, এবং তার চারপাশে দেয়ালগুলো তখন ফেটে যাচ্ছিল।
তিনি আরও বলেন, তার রান্নাঘরটি ধসে পড়েছে। বসার ঘরের দেয়ালটি প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম, আর একটি ঝাঁকুনিতেই এটি ভেঙে পড়বে।
দিয়াজ বলেন, ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কায় তিনি রাস্তায় রাত কাটানোর পরিকল্পনা করছেন।
তিনি বলেন, ‘সেই মুহূর্তে আমি শুধু আমার জপমালা, আমার কাছে থাকা ফোন এবং জামাকাপড় নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। এই অল্প কয়েকটা জিনিস আনতে ভেতরে গিয়েছিলাম, কারণ আমি সেখানে থাকতে পারব না। এটা ভীতিকর এবং যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।’
বিবিসির মুন্দোতের (স্প্যানিশ ভাষার সংবাদ বিভাগ) সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার ভূমিকম্পের সময় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সাত তলায় ছিলেন। এবং তার ভবনটি তভন ভয়াবহভাবে নড়ছিল। কারাকাসের মধ্যাঞ্চলের পালোস গ্রান্দেসে এই ভবনটি অবস্থিত।
নিকোল বলেন, ‘আমি জানালাগুলো নড়তে দেখলাম। নিজেকে রক্ষা করার জন্য সামনের দরজা আর একটা পাথরের দেয়ালের মাঝখানে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আমার মাথায় তখন আর কিছুই আসেনি। দেয়ালটা মজবুত বলে মনে হয়েছিল।’
নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলছিলেন,‘আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটা। মনে হচ্ছিল, পুরো ভবন মাথার ওপর ভেঙে পড়বে।’
একপর্যায়ে নিকোলের প্রতিবেশীরা চিৎকার করতে করতে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তখন তিনিও ঘরের বাইরে আসেন।

ভেঙে পড়া দোকানের ভেতর জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন এক কর্মী। ছবি: বিবিসি
কারাকাসের পূর্বাঞ্চলে ছিলেন আরেকজন ৫৬ বছর বয়সী নারী প্রত্যক্ষদর্শী কোরো মার্তিনেজ। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় ‘বিকট শব্দ’ হয়েছিল। ঘরে জিনিসপত্র, এমনকি ফ্রিজের ভেতরে থাকা জগগুলোও একের পর এক পড়ে গেল। আমি আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।’
এর আগে ১৯৬৭ সালে কারাকাসে এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে মারিয়া রোমেরো নামের একজন বলেন, ‘এবারেরটা ওই ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ ছিল।’
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় কারাকাস থেকে পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।
জোড়া ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে অল্প সময় পরই তা তুলে নেয় কর্তৃপক্ষ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, কারাকাসের বারুতা জেলায় দুটি ভবন ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জেলার মেয়র জানিয়েছেন।
হতাহতের সরকারি সংখ্যা ধীরে ধীরে আসছে, কিন্তু ইউএসজিএস অনুমান করেছে যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দুর্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
দিনটি সাপ্তাহিক কর্মদিবস হলেও ১৮২১ সালের কারাবোবোর যুদ্ধ স্মরণে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হচ্ছিল। তাই ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় অনেকেই বাড়িতে ছিলেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে আসা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রাস্তায় কিছু মানুষ কাঁদছেন এবং অন্যরা একে অপরকে আলিঙ্গন করছেন।
ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালগুলোতে আহত ব্যক্তিরা ভিড় করছেন। কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যালয় ও রেলসেবা।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।