যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে চীনের ওপর চাপ বাড়িয়েছিল ওয়াশিংটন। উদ্দেশ্য ছিল, ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে সহায়তা করা। তবে প্রায় ৪০ ঘণ্টার বেইজিং সফর ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং–এর সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পরও ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে বড় কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত মেলেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ-হরমুজ প্রণালি ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থানে মূল মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ফলে বহুল আলোচিত এই বৈঠক থেকেও দৃশ্যমান কোনো সমঝোতা আসেনি।
শুক্রবার (১৫ মে) আলজাজিরার প্রতিবেদেনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে চীনের অবস্থান
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। পালটা জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এরপর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে।
ওয়াশিংটন দাবি করেছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
চীন সফরের সময় দেওয়া এক বিবৃতিতে বেইজিং আবারও যুদ্ধের বিরোধিতা করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই সংঘাত শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের জনগণের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়েছে। তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
চীন আরও জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করছে এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত ৪ দফা শান্তি পরিকল্পনা অনুসরণ করেই তারা এগোতে চায়। ওই পরিকল্পনায় রাজনৈতিক সংলাপ, যৌথ নিরাপত্তা, উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উভয় পক্ষ কী বলেছে?
হোয়াইট হাউস বৃহস্পতিবার এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে জানায়, ‘জ্বালানি সরবরাহের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।’
মার্চের শুরু থেকে ইরান প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই সরু জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হতো। ইরান কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও, তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি নিয়ে জাহাজ পার হতে হয়।
যুদ্ধ বন্ধে আগের প্রস্তাবগুলোতে ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ফি বা টোল আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওয়াশিংটন বারবার এই সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেছে। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়া জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে আরও বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
বেইজিংয়ে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সি চিন পিং হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণের বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে এ নৌপথ ব্যবহারে কোনো ধরনের টোল আরোপের বিরোধিতা করেছেন এবং সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে স্বীকার করে বলেছে, ‘এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ তবে চীনের বিবৃতিতে ইরানের সম্ভাব্য টোল বা প্রণালির সামরিকীকরণ নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই দুই দেশের অবস্থানের বড় পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। কারণ চীন একদিকে ইরানি তেলের বড় ক্রেতা, অন্যদিকে উপসাগরীয় জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ভিন্ন অবস্থান
হোয়াইট হাউস বৈঠকের পর জানায়, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, সে বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে একমত হয়েছেন শি জিন পিং। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেবে না।
তবে চীনের বিবৃতিতে এমন কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। বেইজিং বলেছে, ইরানের পারমাণবিক ইস্যুসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়েই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।
চীন অতীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ ও রাশিয়ার সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবার তারা স্পষ্টভাবে কোনো নতুন অবস্থান নেয়নি।
যে কারণে অগ্রগতি হয়নি?
বিশ্লেষকদের মতে, মূলত কেউই নিজেদের পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, চীন ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে সক্রিয় ভূমিকা নেবে। কিন্তু বেইজিং কৌশলগতভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে।
বৈঠকের আগে মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা চীনের সহযোগিতা চাইলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে আমাদের কারও সহায়তার প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবেই হোক এ যুদ্ধে জয়ী হবে।’
একই দিন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ক্যাপিটল হিলে ইরান যুদ্ধ ও এর বাড়তি ব্যয় নিয়ে শুনানিতে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ইরানের ওপর চীনের অনেক প্রভাব রয়েছে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, ‘আমার মনে হয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে।’
তবে বৈঠকের আগে এবং চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চীনের কাছে আরও সরাসরি অনুরোধ জানিয়েছেন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সপ্তাহে বলেন, ‘ইরানের হামলায় প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা এটি আবার খুলছি। তাই আমি চীনকে এই আন্তর্জাতিক অভিযানে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাই।’
বেইজিং থেকে সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্কট বেসেন্ট আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে চীন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, এটি চীনের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
চীনে অবস্থানকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন বেইজিংকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করবে, যদিও তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সহায়তা প্রয়োজন নেই।
চীন এবং জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নির্ভরতার প্রসঙ্গ টেনে রুবিও বলেন, ‘এটি তাদের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, ইরানকে বর্তমান কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে রাজি করাতে চীন আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।’
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে যুদ্ধবিরতি বা নতুন কূটনৈতিক অগ্রগতির বদলে দুই দেশের পুরোনো অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। কৌশলগত অংশীদার হওয়ায় চীন ইরানের ওপর খুব বেশি চাপও দেবে না। ফলে ইরান যুদ্ধের সমাধানে এখনও কার্যকর কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা গড়ে ওঠেনি।