Friday 15 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সংকট, ২০ দিনে ৮১ মৃত্যু

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ মে ২০২৬ ২০:৪৩ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ ২১:১৫

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ।

রংপুর: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সংকটে গত ২০ দিনে অন্তত ৮১ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের হিসাবে আইসিইউতে ভর্তি রোগীর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা আরও কম।

উত্তরবঙ্গের আট জেলার প্রায় ৩ কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। কাগজে-কলমে ১ হাজার ৫০০ শয্যা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১০টি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

মৃত্যুর হিসাব নিয়ে ভিন্ন চিত্র 

হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তথ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় ভিন্নতা দেখা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী গত ২০ দিনে ৮১ জন রোগী আইসিইউ সেবা না পেয়ে মারা গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইসিইউতে ভর্তি ৭৯ জনের মধ্যে মারা গেছে ২৯ জন। তবে এই হিসাবে আইসিইউর বাইরে, সাধারণ ওয়ার্ড বা করিডোরে সেবা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনা অন্তর্ভুক্ত নয়।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের এক নার্স বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ জন রোগী আইসিইউ সেবা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত ৩০-৪০টি শয্যা বাড়ানো জরুরি।’

করিডোরে অপেক্ষা, স্বজনদের ক্ষোভ

হাসপাতালের করিডোর এখন অনেক ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার স্থান হয়ে উঠেছে। আইসিইউ শয্যা খালি হওয়ার অপেক্ষায় দিনের পর দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেন ছাড়া আইসিইউ বেড পাওয়া যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবিদ হাসান বলেন, ‘শুধু নামেই হাসপাতাল, ন্যূনতম সেবা নেই। আইসিইউ বেড পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যার ক্ষমতা আছে, টাকা আছে—তাদের জন্য বেড পাওয়া সহজ।’

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের আফরোজা খানম জানান, চারদিন অপেক্ষার পর অনেক কষ্টে তিনি স্বামীর জন্য একটি শয্যা পেয়েছেন। তার অভিযোগ, শুধু শয্যার অভাব নয়, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দক্ষ চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতিও প্রকট।

এদিকে, কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরের এক রোগীর স্বজন জানান, দুইদিন ধরে রোগী সাধারণ ওয়ার্ডেই আইসিইউর অপেক্ষায় আছেন।

জনবল ও সরঞ্জাম সংকট

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সঙ্কট রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শয্যা নয়, প্রশিক্ষিত জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া আইসিইউ কার্যকর করা সম্ভব নয়।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল হক বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, শুধু আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করেই কাজ শেষ হয় না, সেখানকার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনিশিয়ান। দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা অকেজো হয়ে পড়ে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা সরকারি হাসপাতাল।’

চিকিৎসকদের হিসাব

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আলফে সানি মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন ৩ হাজার রোগীর মধ্যে কমপক্ষে ১০ শতাংশের আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, যার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০০। এই চাহিদার তুলনায় মাত্র দশটি শয্যা একেবারেই অপ্রতুল। বাস্তব চাহিদা মেটাতে প্রায় ১০০টি আইসিইউ শয্যা দরকার।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের জন্য ৫৬০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হওয়ায় বর্তমান সংকটে তাৎক্ষণিক সমাধান দিচ্ছে না।

এদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরেই ৪৬০ শয্যার একটি আধুনিক ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এটি চালু হলে চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কিন্তু চিকিৎসক ও সেবাপ্রত্যাশীরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন জরুরি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর