Friday 15 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ট্রাম্পের চীনের বাজার ‘উন্মুক্ত’ করার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কোনো চুক্তি হয়নি

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
১৫ মে ২০২৬ ১০:৫৩ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ ১২:৫৮

আজ সকালে আলোচনার আগে দুই নেতা। ছবি: রয়টার্স

দুই দেশের সম্পর্ক যখন তলানিতে ঠিক তখনই চীন সফরে গিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনা নেতা শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসার আগে ট্রাম্পের প্রত্যাশার পারদ ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। তিনি সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে নিয়েছেন তার দেশের একঝাঁক শীর্ষ ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীদের। ট্রাম্প ও শি এর আলোচনার আজ শেষ দিন। শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে এখন পর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপ এবং সতর্কভাবে পরিচালিত প্রতীকী কর্মকাণ্ড দেখা গেলেও, এ আলোচনা থেকে বড় কোনো অর্থনৈতিক ফলাফল সামনে আসেনি।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বেইজিং সফরে ট্রাম্পের সরকারি প্রতিনিধিদলে আছেন সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্কসহ মেটা, ভিসা, জেপি মরগান, বোয়িং, কারগিলসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা।

বিজ্ঞাপন

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের বিশেষ গুরুত্ব আছে। সেই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক নানা বিষয় তো আছেই।

প্রথমদিনে শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতাদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ভাষণসহ ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা। তারপরও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাপক বাণিজ্যিক অগ্রগতি বা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক চুক্তির ঘোষণা আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার (১৪ মে) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর সঙ্গে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বৈঠক করেন। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

হোয়াইট হাউস বৈঠকটিকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, এটি সম্ভবত ‘এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শীর্ষ বৈঠক’।

এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন শি জিন পিং। তবে একই সঙ্গে তিনি তাইওয়ান ইস্যুতে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘এটি ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি দ্বন্দ্বেও যেতে পারে।’

এই বৈঠকের পর ট্রাম্প ও সি অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় সম্মত হওয়া তাদের বাণিজ্য যুদ্ধের এক বছরের বিরতি বাড়াবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশ্বের বৃহত্তম এই দুই অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন নয়, বরং স্থিতিশীলতা আসবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই দুই দেশ বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে তাইওয়ানের মর্যাদা পর্যন্ত সবকিছু নিয়ে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।

আর্নল্ড অ্যান্ড পোর্টারের সিনিয়র কাউন্সেল, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ে (ইউএসটিআর) চীন বিষয়ক প্রাক্তন কর্মী ক্লেয়ার ই রিড আল জাজিরাকে বলেন, ‘এখানকার সম্পর্কের অবস্থা সম্পর্কে বাস্তববাদী হওয়া জরুরি।’

রিড বলেছেন, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং তারা যেটিকে দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে চায়।’

যদিও ট্রাম্প ও শি এখনও কোনো বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা করেননি, মার্কিন পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রচারিত ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চীন তার প্রতিনিধিদলে থাকা সিইওদের পরিচালিত সংস্থাগুলোতে “কয়েকশ বিলিয়ন ডলার” বিনিয়োগ করবে, তবে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

ট্রাম্প আরও বলেছেন যে, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের তেল এবং ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ‘বিনিয়োগ বোর্ড’ গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

কেন শি জিন পিংয়ের চুক্তির প্রয়োজন নেই?

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ লি দাউকুই বলেছেন, ইরান ইস্যুটি আসলে চীনকে সাহায্য করছে।

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া শীর্ষ সম্মেলনে ইরান যুদ্ধ শি জিন পিংকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। গত অক্টোবরের পর এটিই দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। হোয়াইট হাউস চীনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যাতে তারা তেহরানের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেয়। কারণ, চীন নিষিদ্ধ ইরানি তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা।

চীন ইরান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য উৎসাহিত করেছে। তবে তারা এমন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক, যা সমাধানের দায়িত্ব মূলত ওয়াশিংটনের বলে তারা মনে করে। চীন সরাসরি সামরিকভাবে না জড়ালেও তারা হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়েই চীনের আমদানি করা তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়।

লি বলেন, চীনের পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে যেখানে বলা হবে, ‘চলুন আমরা ইরানকে প্রণালিটি খোলা রাখতে রাজি করাতে একসঙ্গে কাজ করি।’ তিনি আরও যোগ করেন, বেইজিং সম্ভবত এই নিশ্চয়তাও চাইবে, যুক্তরাষ্ট্র যেন ওই জলপথ অবরোধ না করে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করার বিনিময়ে তেহরানকে ঋণ, বিনিয়োগ ও যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠনে সহায়তার মতো বিভিন্ন প্রলোভন দেখাতে পারে চীন। তবে বেইজিং সম্ভবত তেহরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে চাপ দেবে না।

ট্রাম্পের কাছ থেকে শি জিন পিং যা সবচেয়ে বেশি চান, তা অন্য কিছু, সেটি হচ্ছে তাইওয়ানে। শি এই দ্বীপ ভূখণ্ডটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শিথিল করতে চান; সেটি হতে পারে অস্ত্র বিক্রি বিলম্বিত বা হ্রাস করার মাধ্যমে, অথবা ওয়াশিংটন তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধী—এমন কোনো বিবৃতির মাধ্যমে।

ট্রাম্প এই সপ্তাহে আবারও বলেছেন, তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি যদি তা করেন, তবে ট্রাম্প ‘সিক্স অ্যাসিউরেন্স’ বা ছয় নিশ্চয়তা নামক দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন নীতির একটি স্তম্ভ।

১৯৮২ সালে রোনাল্ড রিগান আমলের এই নিশ্চয়তাগুলো তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যার একটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করবে না।

ট্রাম্প যদি এ বিষয়টি আলোচনার টেবিলে তোলেন, তবে তা হবে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে এক বড় বিচ্যুতি এবং এটি সির জন্য বড় এক বিজয় হিসেবে গণ্য হবে।

বেইজিংয়ের জন্য এই শীর্ষ সম্মেলন হয়তো নির্দিষ্ট কিছু ছাড় আদায়ের চেয়েও দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্পর্কের ধরনটি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

শি হয়তো স্বীকৃতি চাইতে পারেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির তার দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমান। তিনি তার দেশের নেতা হিসেবে ট্রাম্পের সমকক্ষ। ২০১২ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শি এটি চেয়ে আসছেন। চীনা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের বোঝাপড়া একটি স্থিতিশীল সম্পর্কের সূচনা করবে, যেখানে অস্বস্তি থাকলেও দুই পক্ষ সহাবস্থান করতে পারবে।

সারাবাংলা/এএ