ইরানে গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ভূপাতিত দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের একটির নিখোঁজ ক্রুকে সফলভাবে উদ্ধার করেছে মার্কিন বাহিনী।
বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধার হওয়া অফিসার বর্তমানে নিরাপদ ও সুস্থ আছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযান যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল:
শুক্রবার দক্ষিণ ইরানের পার্বত্য অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর দুই দেশের বাহিনীর মধ্যেই নিখোঁজ ক্রুদের খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিমানে থাকা দুইজন ক্রু সদস্যই ইজেক্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর মধ্যে প্রথমজনকে আগেই উদ্ধার করা হয়েছিল। দ্বিতীয় জনকে উদ্ধারে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ইতিহাসের অন্যতম “দুঃসাহসিক” কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) মিশন পরিচালনা করে।
সিএসএআর হলো মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তার মিত্রদের প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে জটিল এবং সময়-সংবেদনশীল অভিযানগুলোর মধ্যে একটি। সিএসএআর মিশনের দায়িত্বে থাকা বিমান বাহিনীর ইউনিটগুলোতে সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে উচ্চ প্রশিক্ষিত এবং বিশেষায়িত সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকেন।
এই মিশনগুলো প্রায়শই হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা শত্রু অঞ্চলের উপর দিয়ে নিচুতে উড়ে যায় এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য সামরিক বিমানও থাকে, যেগুলো হামলা চালায় ও এলাকাটিতে টহল দেয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানে মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের দুটি উড়োজাহাজ ধ্বংস করতে হয়েছে।
অভিযানকালে মার্কিন কমান্ডোরা ‘শত্রুদেশের’ বেশ ভেতরে ঢুকেছিলেন। অভিযানটি চালায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস’। এই অভিযানের বিষয়ে জানাশোনা আছে—এমন কয়েকজন বর্তমান–সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহত এই ক্রুকে খুঁজে বের করতে, তার কাছে পৌঁছাতে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে টানা দুই দিনের প্রতিযোগিতা চলে। শেষ পর্যন্ত কয়েক শ মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যের অংশগ্রহণে বড় পরিসরের এক অভিযানে তাকে উদ্ধার করা হয়।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ওই বিমানসেনা ছিলেন একজন কর্নেল। তিনি ইরানের পাহাড়গুলোর পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। আমাদের শত্রুরাও তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, যারা প্রতি ঘণ্টায় আরও কাছে এগিয়ে আসছিল।’
প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনাকারী ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা ওই বিমানসেনার অবস্থান ২৪ ঘণ্টাই পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে কয়েক ডজন বিমান পাঠিয়েছে এবং দাবি করেছেন যে এই অভিযানে কোনো আমেরিকান নিহত বা আহত হননি।
অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর কয়েক শ সদস্য অংশ নেন। এ ছাড়া অভিযানে অংশ নেয় কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার। যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার, মহাকাশ ও গোয়েন্দা সক্ষমতা এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়।
ক্রু যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, সেই এলাকা থেকে ইরানি বাহিনীকে দূরে রাখতে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ও গুলিবর্ষণ করা হয়। অভিযান সম্পর্কে জানেন—এমন দুজন সাবেক মার্কিন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, অভিযানকালে নিখোঁজ ক্রুর দিকে মার্কিন বাহিনী এগিয়ে গেলে সেখানে গোলাগুলি শুরু হয়।
একপর্যায়ে ক্রুকে উদ্ধার করা হয়। তার কাছে আত্মরক্ষার জন্য একটি পিস্তল ছিল। ক্রুসহ কমান্ডোদের নিরাপদে নিয়ে যেতে যে দুটি পরিবহন উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছিল, সেগুলো ইরানের এক প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে আটকে পড়ে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত আরও তিনটি উড়োজাহাজ পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আটকে পড়া উড়োজাহাজ দুটি যাতে ইরানের হাতে না পড়ে, সে জন্য বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয় বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার মার্কিন যুদ্ধবিমানটি যে এলাকায় ভূপাতিত করা হয়, সেই এলাকায় সরকারবিরোধীদের অবস্থান বেশ জোরালো। তাই নিখোঁজ থাকা ক্রু চাইলে আশ্রয় ও সহায়তার জন্য স্থানীয় লোকজনের ওপর নির্ভর করতে পারতেন।
বিষয়টি ইরানের সামরিক বাহিনীর নজরে আসে। তারাও নিখোঁজ ক্রুকে ধরতে জোর তল্লাশি শুরু করে। সেই সঙ্গে তাকে খুঁজে পেতে ইরান সরকার স্থানীয় মানুষের সহায়তা চায়। পুরস্কার ঘোষণা করে।
বিবিসি জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল এবং বিমান থেকে প্রাথমিক ইজেকশনের সময় পাইলট আহত হয়ে থাকতে পারেন।
ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। এছাড়া, নিখোঁজ পাইলটকে খোঁজার সময় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি মার্কিন ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে, অভিযানে অংশ নেওয়া দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে স্থানীয় যাযাবর উপজাতিরা গুলি চালিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে আইআরজিসি-র জনসংযোগ দফতর জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইসফাহান প্রদেশে একটি আমেরিকান ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত জটিল এবং উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হয়। যুদ্ধবিমানের ক্রুরা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত থাকেন, যাতে তারা উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারেন।
ভূপাতিত বিমানের ক্রুরা এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত প্রশিক্ষিত।
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বিবিসি-কে বলেন, ‘শত্রু দেশে আটকেপড়া সামরিক সদস্যদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বেঁচে থাকা এবং ধরা পড়া এড়ানো।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়-যদি তারা শারীরিকভাবে সক্ষম থাকে এবং এমনভাবে আহত না হয় যে নড়াচড়া করতে পারবে না—তবে যত দ্রুত সম্ভব ইজেকশন সাইট থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে এবং নিজেদের এমনভাবে লুকিয়ে রাখতে যাতে তারা নিরাপদ থাকে।’
কাভানাঘ আরও বলেন, তাদের বেঁচে থাকার কৌশল সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা যতদূর সম্ভব খাবার বা পানি ছাড়া থাকতে পারেন, অথবা স্থানীয় এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজে নিতে পারেন।
এফ-১৫ বিমানটি ঠিক কোথায় ভূপাতিত হয়েছিল তা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দুটি সম্ভাব্য প্রদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে – কোহগিলুয়েহ, বোয়ের-আহমাদ এবং খুজেস্তান।