ঢাকা: দেশে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকায় গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, প্রকৃত বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত ডলার কেনাবেচা ও প্রশাসনিকভাবে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং চাহিদা-জোগানভিত্তিক করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে আইএমএফ জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিদিন একটি রেফারেন্স রেট ঘোষণা করছে, যা বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার দর চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে না, বরং নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যেই লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, এটি আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, তারা বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। কেবল একটি রেফারেন্স রেট প্রকাশ করা হয়, যার ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন পরিচালনা করে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিকৃতি সৃষ্টি হতে পারে। এতে রপ্তানিকারক, আমদানিকারক এবং প্রবাসী আয় প্রেরণকারীদের জন্য ভুল প্রণোদনা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাও চাপের মুখে পড়তে পারে।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, তারা এরইমধ্যে নির্ধারিত বিনিময় হার ও ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে ডলারের লেনদেন মূলত চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পুরোপুরি মুক্ত বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা সম্ভব নয়। সে লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আইএমএফ আরও উল্লেখ করে, সাম্প্রতিক সময়ে বিনিময় হারকে আরও বাজারমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানো কিংবা বিনিময় হারের অস্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকাতে ডলার কেনাবেচা করছে। এসব হস্তক্ষেপকে সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা দেখা দিলে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। ডলারের দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ, আমদানি ব্যয় স্থিতিশীল রাখা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত হস্তক্ষেপ করা হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট বিনিময় হার ধরে রাখার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বাজারের অস্বাভাবিক অস্থিরতা কমানোর জন্য।
তারা আরও জানান, সম্পূর্ণ মুক্ত বিনিময় হার ব্যবস্থা চালুর আগে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও গভীর ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে আনা, প্রবাসী আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাহিত করা এবং ডলারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব প্রস্তুতি ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব ধরনের হস্তক্ষেপ একযোগে বন্ধ করলে বাজারে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রায় ট্রেড ফাইন্যান্সের সুদের সীমা কমানোর বিষয়েও আপত্তি জানায় আইএমএফ। সংস্থাটি উল্লেখ করে, গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেড ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে ‘অল-ইন-কস্ট’ সীমা ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা বাজারে হস্তক্ষেপের শামিল। তাদের মতে, এ সীমা আগের অবস্থায় রাখা উচিত ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, ‘অল-ইন-কস্ট’-এর মধ্যে সুদের পাশাপাশি কমিশন, ফি এবং অর্থায়ন-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য চার্জও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত কোনো চার্জ আরোপের সুযোগ নেই। মার্কিন ডলারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক এসওএফআর (SOFR)-এর ভিত্তিতে বৈদেশিক অর্থায়ন সহজ করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ডলারবাজারে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয়নি বলেও দাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।