Tuesday 16 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সিগারেটের নতুন মূল্যস্তরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কমার শঙ্কা

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৬ জুন ২০২৬ ১৭:১৫ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ ১৭:২২

ঢাকা: সিগারেটের নতুন মূল্যস্তরের কারণে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পরিবর্তে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের দাম উচ্চ স্তরে বেশি বাড়ানো হলেও নিম্ন স্তরে বাড়ানো হয়েছে খুবই সামান্য। এর ফলে বাজারে নিম্ন স্তরের সিগারেটের ভোক্তা আরও বেড়ে যাবে। এতে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা কমে যেতে পারে।

একক খাত হিসেবে তামাক থেকেই সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণ করে থাকে সরকার। সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিগারেটের শুল্ক-কর ও দাম বাড়ানোর ফলে এ খাতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতের রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা চলছে।

ঠিক এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের প্রতিটি মূল্য স্তর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নিম্ন স্তরের সিগারেটের তুলনায় উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে অনেক বেশি হারে। অথচ সিগারেটের ৯০ শতাংশ ভোক্তা নিচের দুইটি স্তরের।

সিগারেটের নতুন মূল্যস্তরের কারণে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর টার্গেট দেওয়া হয়েছে। ছয় লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে হবে এনবিআরকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে মে পর্যন্ত সব খাতে রাজস্ব আহরণে গড় প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাসহ নানা কারণে লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। এমন সময়ে সিগারেট খাতের নতুন মূল্যস্তর কার্যকর হলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘সিগারেটের বর্তমান মূল্যস্তরে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে তা জাতীয় রাজস্ব আহরণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সরকারের অন্যতম বৃহৎ এই রাজস্ব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামগ্রিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

এনবিআরের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত স্তরের সিগারেটের দাম কার্যকরভাবে না বাড়ালে রাজস্ব আয় বাড়ার সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে যাবে। এতে বাজারে কমদামি সিগারেটের আধিপত্য আরও বাড়বে, পাশাপাশি কমে যাবে লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ।’

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনবিআর শিগ্গিরই নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রস্তাবিত দাম পুনর্মূল্যায়নের জন্য অর্থমন্ত্রীকে একটি চিঠি পাঠাতে পারে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে বাজেট প্রক্রিয়ায় নতুন দিক নির্দেশনা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে নিচের স্তরের সিগারেটের ন্যূনতম দাম প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৬০ টাকা থেকে মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ টাকা করা হয়েছে। বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম প্রতি ১০ শলাকায় ৮০ টাকা থেকে ১২ টাকা বেড়ে হচ্ছে ৯২ টাকা। উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে হবে ১৬০ টাকা। এক্ষেত্রে ১০ শলাকায় দাম বাড়ছে ২০ টাকা। প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটে প্রতি ১০ শলাকায় দাম বাড়ছে ২৫ টাকা। এটি ১৮৫ থেকে বেড়ে ২১০ টাকা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর ও মূল্য বৃদ্ধি সাধারণত দুটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে করা হয়। তা হলো সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা। কিন্তু আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের বিভিন্ন স্তরের মূল্যবৃদ্ধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই দুই লক্ষ্য অর্জনের পথেই বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে। কারণ নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে খুবই কম। অন্যদিকে উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে অনেক বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব আদায় দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে। তাই আগামী ৩০ জুন প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পাস হওয়ার আগেই সিগারেটের নতুন মূল্যস্তর সংক্রান্ত প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় তামাকের ব্যবহার কমাতে হলে কেবল উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়ালেই হবে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হতে পারে নিম্নমূল্যের সিগারেটের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে স্তরভিত্তিক দামের বৈষম্য দূর করা।