Friday 17 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ইবি শিক্ষার্থী সাজিদ হত্যা: বিচারহীনতার এক বছর

ইবি করেসপন্ডেন্ট
১৭ জুলাই ২০২৬ ১২:৫২ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ ১৫:৪৬

শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ।

ইবি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের এক বছরেও অপরাধীদের চিহ্নিত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস সোসাইটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) সংগঠনটির সভাপতি আলী আহসান মুহাম্মদ জুবাইর ও সাধারণ সম্পাদক মো. খাদেমুল ইসলাম এক যৌথ বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে মানবাধিকারকর্মীদ্বয় বলেন, গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৭ জুলাই বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল সংলগ্ন পুকুর থেকে সাজিদ আব্দুল্লাহর লাশ উদ্ধার করা হয়। ভিসেরা রিপোর্ট অনুযায়ী, তাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়, যা দেশজুড়ে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিলেও, গত এক বছরে তদন্ত প্রক্রিয়া ও আইনি কার্যক্রমে স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন শিক্ষার্থীর এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এক বছরেও ঝুলে থাকা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধীদের যেমন উৎসাহিত করে, তেমনি ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ জনগণের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

তারা আরও বলেন, কোনো হত্যাকাণ্ড বা অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে থাকা নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সাজিদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যে মানসিক যন্ত্রণা ও ন্যায়বিচারের আকুতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া এরূপ অপ্রত্যাশিত ঘটনা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৭ জুলাই বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল-সংলগ্ন পুকুর থেকে সাজিদ আব্দুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ৩ আগস্ট প্রকাশিত ভিসেরা প্রতিবেদনে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পোস্টমর্টেমের অন্তত ৩০ ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ ১৬ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

পরদিন ৪ আগস্ট সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পরে থানা পুলিশ থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইড)—এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে প্রায় ১০ মাস তদন্ত করেও মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি সিআইডি। এ সময় বিচার দাবিতে ক্যাম্পাসে দফায় দফায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মিত সিআইডিকে দিয়ে মামলার অগ্রগতি নিয়ে ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করলেও কয়েক মাস ধরে সেই ব্রিফিংও বন্ধ রয়েছে।

মামলার তদন্তে দীর্ঘদিনেও অগ্রগতি না হওয়ায় সাজিদের বাবার আবেদনের পর গত মে মাসে তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে পরিবর্তন করে ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সাজিদের পরিবার। তাদের অভিযোগ, এক বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি সম্পর্কে তারা অবগত নন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, বিচারহীনতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ হয়ে আছে এই হত্যাকাণ্ড। হত্যার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার তো দূরের কথা, খুনিদেরও শনাক্ত করা যায়নি। এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিআইডির চরম ব্যর্থতা। এই বিচারহীনতা আমাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে, রাতের বেলা ক্যাম্পাসে হাটতেও ভয় লাগে। কিছুদিন আগেও তো ক্যাম্পাসে আমাদের এক শিক্ষিকাকে তার ব্যক্তিগত রুমে হত্যা করা হলো। এভাবে আর কত লাশ পেলে প্রশাসন বিচার নিশ্চিত করবে? আমরা দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ বলেন, আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোনো অগ্রগতি নেই। এক বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার পাইনি। সিআইডির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে, কিন্তু কোনো আপডেট পাই না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ নেই। আমার কাছে সিআইডি, পুলিশ প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—সবারই গাফিলতি রয়েছে বলে মনে হয়। আগামী রোববার আমি একটি সংবাদ সম্মেলন করব।

মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআইডি ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করেছি এবং কয়েকজন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। ঘটনাস্থল তিনবার পরিদর্শন করেছি। তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আমাদের আরও কিছু সময় প্রয়োজন। আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করছি এবং অবশ্যই একটি ফল পাওয়া যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমি নিয়মিত সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করছি। দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিতে তাদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে শিক্ষিকা রুনা হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে সাজিদ হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এমন কমিটি গঠন করা হবে।

শিক্ষাঙ্গণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় অবিলম্বে সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জোর দাবি জানাচ্ছি। এছাড়া ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় আইনি ও নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস সোসাইটি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর