কুমিল্লা: কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের আয়তন প্রায় চারগুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দীর্ঘদিনের আলোচিত এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বর্তমান ৫৩ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সিটি করপোরেশন বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২৩৫ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটারে। এতে কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ, বুড়িচং ও লালমাই উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের আওতায় যুক্ত হবে।
প্রস্তাবিত সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও আশাবাদ। অনেকেই মনে করছেন, সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে, বাড়বে অবকাঠামোগত সুবিধা এবং ত্বরান্বিত হবে পরিকল্পিত নগরায়ণ।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রসারণ প্রস্তাবের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা এরইমধ্যে কুমিল্লা পরিদর্শন করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছেন। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে।
বর্তমান নগর সীমানার বাইরে গড়ে ওঠা অসংখ্য আবাসিক এলাকা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার বাইরে রয়েছে। অথচ এসব এলাকার সঙ্গে নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত। ফলে এসব এলাকাকে সিটির আওতায় আনার দাবি স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের।
প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ এলাকার বাসিন্দাদের মতে, সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে উন্নত সড়ক যোগাযোগ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির সরবরাহ, পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইটিং এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা আরও সহজলভ্য হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার কারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আদর্শ সদর উপজেলার সাতরা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমাদের এলাকা শহরের খুব কাছাকাছি হলেও অনেক নাগরিক সুবিধা এখনো সীমিত। সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে রাস্তা, ড্রেনেজ, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য সেবার উন্নয়ন হবে বলে আশা করছি। এতে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে।’
সদর উপজেলার দুর্গাপুর উত্তর ইউনিয়নের আড়াইওরার বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য পারভিন আক্তার বলেন, ‘আমার বাসা থেকে নগরভবনে যেতে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ মিনিট লাগে। অথচ আমরাই সিটি করপোরেশনের বাইরে। আমরা আশাবাদী, দ্রুতই আমরা সিটি করপোরেশনের আওতায় আসব এবং নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা পাব।’
নগরীর মোগলটুলির বাসিন্দা ও ‘কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চ’-এর সদস্যসচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘কুমিল্লা শহর বাস্তবে অনেক বড় হয়ে গেছে। শহরের সঙ্গে সংযুক্ত অনেক এলাকা এখনো প্রশাসনিকভাবে বাইরে রয়েছে। সীমানা সম্প্রসারণ হলে পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং পুরো নগরীকে একক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সহজ হবে।’
তবে সিটি সম্প্রসারণের পাশাপাশি নাগরিক সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর কুমিল্লা জেলা সভাপতি মো. আলমগীর খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারণ সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে শুধু আয়তন বৃদ্ধি করলেই হবে না, নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত ও সমানভাবে নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনবান্ধব সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।’
এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারণ একটি দীর্ঘদিনের প্রস্তাব। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা কুমিল্লা পরিদর্শন করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় সকল ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
স্থানীয়দের মতে, কুমিল্লা এখন দ্রুত সম্প্রসারিত একটি নগরী। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন সম্প্রসারণ, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তৃতি এবং নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার কারণে বর্তমান সীমানা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বৃহত্তর নগর পরিকল্পনার স্বার্থে সীমানা সম্প্রসারণ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ১০ জুন কুমিল্লা পৌরসভাকে উন্নীত করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়। প্রায় দেড় দশক পর আয়তন বৃদ্ধির এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কুমিল্লা একটি বৃহত্তর, আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে নতুন পরিচয় লাভ করবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সচেতন মহল। তাদের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক সম্প্রসারণের পাশাপাশি নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লা দেশের অন্যতম আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে।