Wednesday 24 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লাগামহীন ক্রেটের দাম / সিন্ডিকেটের জালে দিশেহারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষি ও উদ্যোক্তারা

মো. আশরাফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৪ জুন ২০২৬ ০৮:১০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ১০:১২

আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে ক্রেট সংকট।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: মধুমাস জ্যৈষ্ঠের শেষ সময়েও দেশের আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারগুলোতে চলছে জমজমাট বেচাকেনা। তবে মৌসুমের এই প্রাণচাঞ্চল্যের মাঝেই নতুন সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে প্লাস্টিকের ক্রেটের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে আমের মূল্যের চেয়েও বেশি খরচ হচ্ছে ক্রেট ও পরিবহনে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন আম চাষি, ব্যবসায়ী এবং অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তারা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে ক্রেটের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ফলে আমের উৎপাদন ও বিপণন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

 

দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে ক্রেট

পরিবহনের সময় আম যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য বর্তমানে বাঁশের ঝুড়ি বা কার্টনের পরিবর্তে প্লাস্টিকের ক্রেটই সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এ মৌসুমে সেই ক্রেটের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর সাধারণ মানের একটি প্লাস্টিক ক্রেটের দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। এবার একই ক্রেট বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। আর উন্নতমানের বা আমদানিকৃত ক্রেটের দাম উঠেছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।

ফলে ৭০০ টাকা মূল্যের এক মণ আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাতে ক্রেট ও কুরিয়ার খরচ মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। এতে আমের বাজারজাতকরণ ব্যয় পণ্যের মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্রেটের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কম

আম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে মানসম্মত ক্রেট উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মূলত বিদেশ থেকে ফল আমদানির মাধ্যমে আসা ব্যবহৃত বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রি-ইউজড) ক্রেটের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ফল আমদানি কমে যাওয়ায় এসব ক্রেটের সরবরাহও হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনলাইনভিত্তিক আম ব্যবসার ব্যাপক বিস্তারে ক্রেটের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মৌসুম শুরুর আগেই বিপুল পরিমাণ ক্রেট কিনে গুদামজাত করে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে।

আম ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তা মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘আমরা অনলাইনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম সারা দেশে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু ক্রেটের অস্বাভাবিক দাম আমাদের ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমের চেয়ে যদি ক্রেটের পেছনেই বেশি টাকা খরচ হয়, তাহলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’

তার মতো অনেক উদ্যোক্তাই মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনলাইন আম ব্যবসা বড় ধরনের সংকটে পড়বে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ক্রেট সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে ক্রেট তৈরির কারখানা স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. খাইরুল ইসলাম এবং জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক জানান, আম চাষি, ব্যবসায়ী, ক্রেট বিক্রেতা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্রেট উৎপাদন শিল্প গড়ে তুলতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

এদিকে ক্রেট বাজারে অস্থিরতা ও মজুতদারির অভিযোগের পর মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে বা অতিরিক্ত দামে ক্রেট বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল আমের বাজারকে টিকিয়ে রাখতে এবং চাষি ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত ক্রেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়বেন হাজারো চাষি ও উদ্যোক্তা, যার প্রভাব পড়বে দেশের আম বাজারেও।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর