Sunday 07 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সিরাজগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে ‘যমুনার পার’

আশরাফুল ইসলাম জয়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ জুন ২০২৬ ০৯:১৭ | আপডেট: ৭ জুন ২০২৬ ১১:০৩

সিরাজগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনার দ্বার ‘যমুনার পার’। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জ: একদিকে যমুনার উত্তাল তরঙ্গ; আরেকদিকে বড়াল, ইছামতি, করতোয়া, হুরাসাগর, ফুলজোড় বিধৌত পলল ভূমি। আবার এখানেই রয়েছে ভূ-বৈচিত্র্যের বিস্ময় দেশের সর্ববৃৎ বিল ‘চলনবিল’। প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় পরিবর্তনে যমুনাসহ অন্যান্য নদ-নদী কখনো দু’কূল ছাপিয়ে প্লাবিত করে মাঠ-ঘাট-ন্তর। আবার কখনো ভাঙনের ভয়াল রূপ নিয়ে দাঁড়ায় এই এলাকার মানুষের সামনে। মূলত নদীর ভাঙা-গড়ার খেলার মধ্য দিয়েই নিজেদের মানিয়ে নেয় এ অঞ্চলের মানুষ।

এই অঞ্চলের যমুনা সেতু ও সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ বা পারের অপার সৌন্দর্য এ জেলাকে পর্যটনসমৃদ্ধ জেলার খ্যাতি এনে দিয়েছে। এ ছাড়া বিখ্যাত স্থাপত্য ও শিল্পকর্মের নিদর্শন এই জেলাকে করেছে সমৃদ্ধ। এই জেলায় রয়েছে রবীন্দ্র কাচারিবাড়ি, নবরত্ন মন্দির, এনায়েতপুর দরবার শরিফ ও ইলিয়ট ব্রিজ। এসবের বাইরেও উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হলো- জয়সাগর দীঘি, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট, ছয় আনি পাড়া দুই গম্বুজ মসজিদ, যমুনা সেতু ইকোপার্ক, রাউতারা জমিদার বাড়ি, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর বাড়ি, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বাড়ি, কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের বসতভিটা ও নায়িকা সুচিত্রা সেনের জন্মস্থান।

বিজ্ঞাপন

তবে এই সিরাজগঞ্জকে বর্তমানে পরিচিতি এনে দিয়েছে শহর রক্ষা বাঁধ বা ক্লোজার এবং ক্রসবার-৩, যা স্থানীয়দের কাছে ‘চায়না বাঁধ’ নামে বেশি পরিচিত। এটি ধীরে ধীরে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। যমুনার তীরঘেঁষা প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই স্থান প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশাল জলরাশি, খোলা আকাশ, স্পিডবোট ভ্রমণ ও যমুনা সেতুর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এখানে। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি যমুনা ক্লোজার।

যমুনার তীরঘেঁষা সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট। ছবি: সারাবাংলা

যমুনার তীরঘেঁষা সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট। ছবি: সারাবাংলা

সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল হলেই ক্লোজার এলাকায় বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা স্বজনদের নিয়ে অনেকেই সময় কাটাতে আসেন এখানে। বিশেষ করে ঈদ, সরকারি ছুটি ও জাতীয় দিবসগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা অর্ধলাখ ছাড়িয়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। সিরাজগঞ্জ শহরের বাসিন্দা ও দর্শনার্থী সাইদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ক্লোজার অসাধারণ একটি জায়গা। কিন্তু এখানে বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা কষ্টকর হয়ে যায়। যদি সুন্দর পার্ক, বসার স্থান ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে আরও বেশি মানুষ এখানে ভ্রমণে আসতো।’

আরেক দর্শনার্থী সাইফুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের কোনো এলাকায় এমন নদীকেন্দ্রিক পর্যটন স্পট নেই। সিরাজগঞ্জের এই ক্লোজারকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে এটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।’ দর্শনার্থীরা জানান, বর্ষা মৌসুমে বাঁধ নিয়ে আতঙ্ক থাকলেও ক্লোজারের সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নদীর বুকে স্পিডবোট কিংবা নৌকা ভ্রমণ করে উপভোগ করা যায় প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য। নদী থেকে একসঙ্গে দেখা যায় দেশের অন্যতম বৃহৎ যমুনা সেতু ও যমুনা রেলসেতুর নান্দনিক দৃশ্য।

যমুনার পাড়ে ঘুরতে আসা তানিয়া আক্তার সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসার জন্য এই পরিবেশ খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু এখানে উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট, হোটেল বা শিশুদের খেলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এসব সুবিধা থাকলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও বেশি মানুষ আসত।’ আরেক স্থানীয় পর্যটক রোজিনা আক্তার বলেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার, নিরাপদ টয়লেট ও বসার ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন।’

যমুনার তীরঘেঁষা সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট। ছবি: সারাবাংলা

যমুনার তীরঘেঁষা সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট। ছবি: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক সাইদুর রহমান বাচ্চু সারাবাংলাকে বলেন, ‘যমুনা ক্লোজার শুধু একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও একটি বড় ক্ষেত্র। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখানে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পর্যটনসেবা ও পরিবহণ খাতে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অনেক পর্যটন কেন্দ্র সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ক্লোজারেও যদি পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, তাহলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।’

পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা মোস্তফা জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘যমুনা ক্লোজার সিরাজগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসছেন। কিন্তু, সেই অনুপাতে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও বিনোদন অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ক্লোজারকে একটি আধুনিক পর্যটনস্পট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন জেলার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, তেমনি কর্মসংস্থানও বাড়বে।’

যমুনার পারে মানুষের ভিড়। ছবি: সারাবাংলা

যমুনার পারে মানুষের ভিড়। ছবি: সারাবাংলা

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘যমুনা ক্লোজারকে কেন্দ্র করে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। এখানে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং বিনোদন সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যমুনা ক্লোজারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সেই সঙ্গে এর অবস্থান শহরের খুব কাছাকাছি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সহজেই এখানে আসা যায়। এখানে যমুনা নদীকে ঘিরে নৌ-ভ্রমণ, জলক্রীড়া, রিসোর্ট, শিশু পার্ক ও পর্যটননির্ভর ব্যাবসা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সিরাজগঞ্জকে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীভ্রমণ ও মনোরম পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে সিরাজগঞ্জের যমুনা ক্লোজার এরই মধ্যেই মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন প্রয়োজন আধুনিক ও পরিকল্পিত উন্নয়ন। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে যমুনা নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এই ক্লোজার একদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর