বান্দরবান: জেলার সদর উপজেলায় নির্মিত হচ্ছে বিশ্বমানের টিস্যুকালচার ল্যাব। এর নির্মাণ কাজ শেষে গবেষণা শুরু হলে রোগমুক্ত চারায় বদলে যাবে পাহাড়ের কৃষি, স্থানীয় কৃষকরা পাবেন সাশ্রয়ী দামে উন্নত জাতের ফল-ফুলের চারা। বালাঘাটায় নির্মাণাধীন টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি আসছে ডিসেম্বরের মধ্যেই কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য স্থাপনার ল্যাব ভবন, হার্ডেনিং চেম্বার, নার্সারি শেড ও প্রশিক্ষণ কক্ষের মূল স্ট্রাকচারের কাজ শেষ। এখন চলছে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, ল্যাব চালু হলে ফল-ফুলের জীবাণুমুক্ত বিভিন্ন জাতের চারা স্থানীয়ভাবেই উৎপাদন হবে। এতে ফলন ২৫-৩০ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি রোগ-বালাইয়ের ক্ষতি কমবে। বালাঘাটার কৃষক থোয়াইনু অং মারমা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কলার বাগান করি, কিন্তু রোগে অর্ধেক গাছ মরে যায়। ভালো চারা কিনতে গেলে অনেক টাকা লাগে। এই ল্যাব হলে আমরা কম দামে রোগমুক্ত চারা পাব।’
বাগান পাড়ার চাষি চিংইয়েন ম্রো সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ভালো জাতের চারা পাই না। পেলেও দাম বেশি। ল্যাব হলে মানসম্পন্ন চারা হাতের কাছেই পাব। পাহাড়ের জমিতে বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদন করে আমরা ঢাকা-চট্টগ্রামে ফল পাঠাতে পারব। এটা পাহাড়ের কৃষিতে বড় বিপ্লব আনবে।’
ডলুপাড়ার নারী কৃষক মাথুই মার্মা সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা আগে শুধু জুমে কাজ করতাম। এখন ল্যাবের চারা দিয়ে বাণিজ্যিক বাগান করতে পারব। ল্যাবে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিলে আমরাও চারা উৎপাদনের কাজ শিখতে পারব। এতে সংসারে বাড়তি আয় আসবে।’
প্রকল্পের ঠিকাদার মোজাফফর হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বালাঘাটায় নির্মাণাধীন টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টারের কাজটি ১৮ মাসের মধ্যে কার্যসম্পাদনের চুক্তি রয়েছে। সেই হিসাবে ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাছে হস্তান্তর করতে পারব বলে আশা করছি।’
বান্দরবান হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক লিটন দেবনাথ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই ভবনটি হচ্ছে টিস্যুকালচার ল্যাব। যেখানে চারা তৈরি করা হবে টিস্যু ব্যবহার করে। এই ল্যাব পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষিতে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। এটি বিশ্ব মানের ল্যাব, সারাবাংলাদেশে এই ধরনের পাঁচটি ল্যাব রয়েছে। তার মধ্যে বান্দরবানে একটি। এই ল্যাবটি চালু হলে খুব অল্প সময়ে কম খরচে প্রচুর পরিমাণ ফল-ফুলের চারা পাওয়া যাবে। মানের দিক দিয়ে টিস্যু চারা রফতানিযোগ্য। ভবিষ্যতে তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও কক্সবাজার, চট্টগ্রামেও এই চারা রফতানি করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাজ দ্রুতই এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে যন্ত্রপাতি কেনার কাজও শুরু হয়েছে। ভবন চালু হয়ে গেলে আগস্ট-সেপ্টম্বরের মধ্যে ল্যাবের কার্যক্রম চালু হয়ে যাবে। শুধু ভবন চালু করে তো লাভ নেই। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ল্যাব চালু করে চারা তৈরি করা। এই ল্যাবে তৈরি চারা ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া মুক্ত। একটা ভালো গাছ থেকে হুবহু একই মানের হাজার হাজার চারা পাওয়া যায়। ফলনও হয় বেশি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বান্দরবানের বালাঘাটার এই টিস্যুকালচার ল্যাবটি শুধু বান্দরবান নয়, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি,কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের চাষিদের চাহিদাও মেটাবে। এর মাধ্যমে পাহাড়ি ফল-ফুলের বাণিজ্যিক বাগান ও রফতানি বাজার তৈরির পথও সুগম হবে।