Thursday 28 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

তিস্তা পারের ৪৪ ইউনিয়নের ঈদ জামাতে আকাশছোঁয়া মোনাজাত

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৮ মে ২০২৬ ১৯:৪২ | আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ১৯:৪৫

তিস্তা পারের ৪৪ ইউনিয়নের ঈদগাহে আকাশছোঁয়া মোনাজাতে অংশ নেয় মুসল্লিরা। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দের মাঝেই যেন ভিন্ন এক বেদনার সুর। তিস্তার বুকে জল না থাকা আর বর্ষায় নদীভাঙনের তাণ্ডবে জবুথবু উত্তরাঞ্চলবাসী। এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে ঈদুল আজহার দিন (২৮ মে) রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা অববাহিকার ১২টি উপজেলার ৪৪টি ইউনিয়নের ঈদগাহে এক আবেগঘন বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘তিস্তা বাঁচাও-নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’ এই মোনাজাত আয়োজন করে।

সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়া করেন। অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তিস্তা অববাহিকায় পানি সংকট, নদীভাঙন, খরা ও উদ্বাস্তু জীবনের করাল গ্রাস থেকে যেন মানুষ মুক্তি পায়।

বিজ্ঞাপন

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান জানান, তিস্তা উপেক্ষিত মানুষের যন্ত্রণা যেন ঈদের আনন্দকে গ্রাস না করে, সেজন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানানো হয়েছে।

শুধু মোনাজাতেই থেমে থাকছে না সংগঠনটির আন্দোলন। সংগঠনটির সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তারা নদীতীরে বিশেষ মোনাজাত, সভা-সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের কর্মসূচি পালন করেছেন। আগামী ৫ জুন রংপুর মহানগরীতে এক সর্বজনীন সংহতি সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে নদীতীরবর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা অংশ নেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

এদিকে বর্তমান বাস্তবতায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জোরালো হলেও বাস্তবে প্রক্রিয়াটি কতদূর এগিয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে মিশ্র তথ্য। সম্প্রতি সরকারি পর্যায় থেকে বেশ কিছু অগ্রগতির কথা জানানো হলেও স্থানীয়দের কাছে এই ত্রাণের আশা যেন পৌঁছানোর আগেই বাতাসে মিলিয়ে যায়।

সম্প্রতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান থাকায় অদূর ভবিষ্যতেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সরকার। অন্যদিকে, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া নয়, বরং খরার সময় ব্যবহারের জন্য পানি সংরক্ষণের সুযোগ রেখে পরিকল্পনাটি সংশোধন করা হচ্ছে।

তিস্তা পারের ৪৪ ইউনিয়নের ঈদগাহে আকাশছোঁয়া মোনাজাতে অংশ নেয় মুসল্লিরা। ছবি: সংগৃহীত

তিস্তা পারের ৪৪ ইউনিয়নের ঈদগাহে আকাশছোঁয়া মোনাজাতে অংশ নেয় মুসল্লিরা। ছবি: সংগৃহীত

গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানান, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং ১১০ কিলোমিটার নদী খননের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময়সীমা আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে, যা স্থানীয়দের ভোগান্তির মেয়াদ আরও বাড়ানোর শঙ্কা তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে কুড়িগ্রামে তিস্তার তীব্র ভাঙনে প্রতিবছর বিধ্বস্ত হচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। এলাকাবাসী বলছেন, অস্থায়ী বালির বস্তা ফেলার বাইরে কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, ‘যারা সমালোচনা করছেন, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।’ তবে বাস্তবে তিস্তাবাসী এখনও চরম দুর্ভোগে পড়ে আছেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন সারাবাংলাকে বলেন, ‘তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবনজীবিকা।’ তিনি মনে করেন, কেবল ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন চুক্তি নয়, নিজস্ব টেকসই পরিকল্পনা (যেমন সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ও ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ) বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

নেদারল্যান্ডসের মতো দেশের উদাহরণ টেনে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের জন্য আইনি কাঠামো তৈরির কথাও বলছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন এই পরিকল্পনা কাগজে কলমে আটকে থাকে, ততদিন তিস্তার বুকে নীরব হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকবে।’

আয়োজকরা বলছেন, রংপুর অঞ্চলের ঈদগাহ মাঠের সেই কান্না যেন বৃথা না যায়, সেজন্য এখন প্রশাসনিক দ্রুততা ও বাস্তবায়নে তৎপরতা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর