Friday 15 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সুতার দাম ও বিদ্যুৎ সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প বিপর্যস্ত

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ মে ২০২৬ ১৬:৩৬

তাঁতে চলছে কাপড় বোনার কাজ।

সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প সুতার অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে গভীর সংকটে পড়েছে। জেলার বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, কামারখন্দ ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন লাখো শ্রমিক।

স্থানীয় তাঁত বোর্ড ও তাঁত মালিক সমিতির তথ্যমতে, জেলায় প্রায় তিন লাখ তাঁতের মধ্যে এরইমধ্যে এক লক্ষাধিক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা অনেক তাঁতও লোকসানের কারণে অনিয়মিতভাবে চলছে, ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন তাঁতপল্লিতে দেখা গেছে, ঈদ সামনে থাকলেও নেই আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য। বহু কারখানায় তাঁত মেশিন দিনের পর দিন বন্ধ পড়ে আছে। কোথাও শ্রমিকরা অলস সময় পার করছেন, আবার কোথাও মালিকরা লোকসানের হিসাব কষছেন।

বিজ্ঞাপন

বেলকুচি উপজেলার বড়ধুল ইউনিয়নের তাঁত শ্রমিক আব্দুল মালেক বলেন, ‘আগে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতাম। এখন সপ্তাহে ২-৩ দিন কাজ পাই। যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু মজুরি বাড়ছে না।’

শাহজাদপুর উপজেলার জামিরতা এলাকার নারী শ্রমিক রহিমা খাতুন বলেন, ‘তাঁতের কাজ করেই ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা চালিয়েছি। এখন কাজ কমে যাওয়ায় ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।’

এনায়েতপুরের তাঁত শ্রমিক শ‌রিফুল বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে কয়েক ঘণ্টা কাজ বন্ধ থাকে। বিদ্যুৎ না থাকলে তাঁত চলে না। এতে উৎপাদন কমে যায়, আবার সময়মতো অর্ডারও দেওয়া যায় না।’

তাঁত মালিকরা জানান, গত এক বছরে সুতার দাম কয়েক দফা বেড়েছে। আগে যে সুতা প্রতি কেজি ২৮০-৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ৪২০-৪৫০ টাকায়। একইভাবে রঙ, কেমিক্যাল ও অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে বাজার প্রতিযোগিতার কারণে কাপড়ের দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

বেলকুচির তাঁত মালিক আব্দুস সালাম বলেন, ‘একসময় আমার কারখানায় ৪০টি তাঁত চলত। এখন চালু আছে মাত্র ১২টি। সুতার দাম ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় উৎপাদন খরচ এত বেড়েছে যে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

শাহজাদপুরের তাঁত ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছিলাম। কিন্তু এখন লোকসানের কারণে কিস্তি পরিশোধ করতে পারছি না। অনেক মালিক বাধ্য হয়ে তাঁত বিক্রি করে দিচ্ছেন।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, ভারতীয় ও মেশিনে তৈরি কম দামি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চাপেও দেশীয় তাঁতশিল্প টিকে থাকার লড়াই করছে। তবে তাঁতশিল্পের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি প্রণোদনা বা সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।

এনায়েতপুর তাঁতপল্লির ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁতশিল্প শুধু ব্যবসা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। দ্রুত সহায়তা না পেলে এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সিরাজগঞ্জের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা অমৃত সরকার বলেন, ‘তাঁতশিল্পের বর্তমান সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কাঁচামালের দাম সহনীয় রাখা, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট দফতর কাজ করছে। এ ছাড়া তাঁতিদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাঁতশিল্প দেশের ঐতিহ্যের অংশ। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও রয়েছে।’

তবে মাঠপর্যায়ের তাঁতিদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা সুতার ওপর শুল্ক কমানো, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং তাঁতপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শিল্পকে রক্ষা করা না গেলে দেশের অন্যতম বৃহৎ কুটিরশিল্প খাত ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের ঐতিহ্যও।

একসময় যে তাঁতের শব্দে মুখর থাকত সিরাজগঞ্জের জনপদ, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। তাঁত শ্রমিকদের চোখমুখে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। অনেকেই পেশা বদলের কথা ভাবছেন। তবে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেকে এখনও পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর নীতিগত সহায়তা না এলে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই তাঁতশিল্প একসময় হারিয়ে যেতে পারে। তখন শুধু একটি শিল্প নয়, বিলীন হবে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ও।