সিরাজগঞ্জ: প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হলেও নাগরিক সেবার চরম সংকটে পড়েছে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের অধিকাংশ এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙাচোরা সড়ক ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে মাহমুদপুর, মাছিমপুর, হোসেনপুর, জানপুর ও শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় পথচারী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। শহরের অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দিনের পর দিন পানি জমে থাকছে। এতে করে নষ্ট হচ্ছে সড়ক, সৃষ্টি হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
বুধবার (১৩ মে) সরেজমিনে মাহমুদপুর, মাছিমপুর ও হোসেনপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ সড়কে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের ইট ও কার্পেটিং উঠে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব খানাখন্দ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। সকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় নোংরা পানি মাড়িয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। এতে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিশুদের মাঝে স্কুলে যাওয়ার অনীহাও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, ‘প্রতিদিন বাচ্চাদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। রাস্তার অবস্থা এত খারাপ যে, স্কুলে পাঠাতেই ভয় লাগে। পৌরসভা শুধু আশ্বাস দেয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।’
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন রোগী ও বয়স্ক মানুষরাও। জলাবদ্ধতা ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে বিপাকে। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সও ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারছে না।
মাহমুদপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বাবু বলেন, ‘রাতে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে খুব সমস্যা হয়। রাস্তার গর্তে গাড়ি আটকে যায়। বৃষ্টি হলে পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যায়।’
রিকশাচালক আব্দুল খালেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাহমুদপুরের রাস্তা দিয়ে রিকশা চালানো খুব কষ্ট। গর্তে পড়ে প্রায়ই গাড়ির ক্ষতি হয়। যাত্রীরাও উঠতে চায় না। প্রতিদিন আয় কমে যাচ্ছে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম ক্ষতির মুখে। শহরের বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে মালামাল। ক্রেতাদের চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যবসাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হোসেনপুর মহল্লার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই দোকানের সামনে পানি জমে যায়। মানুষ আসতে পারে না। অনেক সময় দোকানের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে। ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি পৌর কর্তৃপক্ষ। অপরিকল্পিতভাবে ছোট ছোট ড্রেন নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর সঙ্গে মূল পানি নিষ্কাশন লাইনের কোনো সমন্বয় নেই। ফলে পানি সহজে বের হতে পারছে না। অনেক ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকলেও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না।
তবে সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সিরাজগঞ্জ পৌরসভার নবনিযুক্ত প্রশাসক শাহাদাত হুসেইন। তিনি বলেন, ‘শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা কাজ শুরু করেছি। কোথায় কী সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ড্রেন সংস্কার, নতুন ড্রেন নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুধু সড়ক সংস্কার করলেই হবে না, প্রয়োজন আধুনিক ও সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও পানি প্রবাহ সচল রাখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সচেতন মহলের ভাষ্য, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হিসেবে সিরাজগঞ্জ শহরের নাগরিকরা ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন। অথচ বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা রাস্তা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও টেকসই উদ্যোগ নেবে বলেই প্রত্যাশা এখন শহরবাসীর।