Friday 21 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ভাগ্য গড়ার লড়াইয়ে ভরসা কেবল‌ দুই পা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৮ মে ২০২৬ ১২:২৩

পা দিয়েই নিজের ভাগ্য গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আয়শা।

গাইবান্ধা: হাত নেই, তাতে কি, তবুও থেমে নেই জীবন। অবহেলা, প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে পা দিয়েই নিজের ভাগ্য গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন গাইবান্ধার সাহসী তরুণী আয়শা আক্তার।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস আয়শার। জন্ম থেকেই নেই তার দুটি হাত। জীবনের শুরুটা ছিল কঠিন বাস্তবতায় মোড়া। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে কখনোই বাধা হতে দেননি তিনি। বরং প্রতিটি প্রতিকূলতাই তাকে করেছে আরও দৃঢ়, আরও আত্মবিশ্বাসী।

শৈশব থেকেই অবহেলা, করুণা আর অবজ্ঞা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এরই মধ্যে হারান তার বাবা দরিদ্র কৃষক আব্দুল লতিফকে। বাবার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। মা মাজেদা বেগমের চোখে তখন একটাই ভয়, তিনি না থাকলে মেয়েকে দেখবে কে? তবে মায়ের সেই ভয়কে শক্তিতে রূপ দিয়েছেন আয়শা নিজেই। তার লক্ষ্য একটাই একটি সম্মানজনক চাকরি, যা বদলে দিতে পারে পুরো পরিবারের জীবন।

বিজ্ঞাপন

দুটি হাত না থাকলেও থেমে থাকেননি তিনি। পা-ই তার হাত। পায়ের আঙুল দিয়েই করেন রান্না, ঘরের কাজ, এমনকি নানা ধরনের পরিশ্রমের কাজও। শুধু তাই নয়, পায়ের আঙুল দিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তিনি। শিখেছেন কম্পিউটার পরিচালনাও যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

জানা যায়, শিক্ষাজীবনেও তিনি রেখেছেন সাফল্যের ছাপ। পায়ের আঙুলে কলম ধরে লিখেই ২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
শুধু পড়াশোনা নয়, কম্পিউটার চালনা ও সেলাইয়ের কাজে নিজেকে দক্ষ করে তুলেছেন। যেন সুযোগ এলেই নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন। চার বোনের মধ্যে তৃতীয় আয়শা। অন্য বোনেরা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিলেও আয়শা এখনো লড়ছেন নিজের জায়গা তৈরি করতে।

কথা হয় আয়শার মা সাজেদা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, জন্মের পর থেকে মেয়ে আয়শাকে নিয়ে চরম কষ্ট করেই আসছি। এত কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে লেখাপড়া করাইছি। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স পাশ করেছে আয়শা। তবে কষ্টের বিষয় এখন পর্যন্ত একটা চাকরি হয় নাই মেয়েটার। এখন একটা চাকরির খুবই প্রয়োজন আয়শার। তাই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে তিনি।

প্রতিবেশী অন্তর মিয়ার সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলে, আয়শা এক অদম্য নারী। যার কোনো তুলনা হয় না। আয়শা ছোট থেকে কষ্ট করে মানুষ হয়েছে। সে কষ্ট করেই মাস্টার্স পাশ করেছে। চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করছে। তার একটি সরকারি বা বেসরকারি চাকরি খুবই প্রয়োজন। তাতে তার কষ্ট ঘুচবে।

স্থানীয় যুবক মুরাদ মিয়া বলেন, তাকে আর্থিক সহায়তা নয়, একটি স্থায়ী চাকরির সুযোগ করে দেওয়া গেলে তার জীবনের মোড় ঘুরে যেতে পারে। তাই সরকারি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

এ বিষয়ে নারী নেত্রী ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গাইবান্ধার সাধারণ সম্পাদক রিকতু প্রসাদ বলেন, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারের উচিত আয়শার পাশে দাঁড়ানো, যাতে তিনি সম্মানের সঙ্গে নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারেন।

আয়শার স্বপ্ন খুব বড় নয়, শুধু একটি সম্মানজনক চাকরি। যাতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন। আয়শার গল্প কেবল সংগ্রামের নয়; এটি এক মায়ের উদ্বেগ, এক মেয়ের নীরব লড়াই এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির অনন্য উদাহরণ। হাত নেই, তবুও থেমে নেই জীবন, কারণ হার মানার সুযোগ নেই তার কাছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর