কক্সবাজার: জেলার রামু উপজেলার রশিদনগরে নির্মাণাধীন একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র প্রকল্পকে ঘিরে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পে বালুর পরিবর্তে আশপাশের পাহাড়ি টিলা কেটে এবং কৃষিজমির উর্বর মাটি ব্যবহার করে ভূমি ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দ্রুত বিলীন হচ্ছে ছোট ছোট পাহাড়, অন্যদিকে কৃষিজমিও হারাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ১০ একর এলাকাজুড়ে লালচে-বাদামী মাটি ফেলে ভূমি সমতল করা হয়েছে। কোথাও কয়েক ফুট উঁচু করে মাটি ভরাট করা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রাক ও ডাম্পারে করে মাটি এনে ফেলার কাজ চলায় পুরো এলাকা এখন মাটির ডিপোতে পরিণত হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস (গ্যাস ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার) সাবস্টেশন নির্মাণ হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ধরনের উচ্চক্ষমতার অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রকৌশল মানদণ্ড অনুযায়ী সাধারণত বালু দিয়ে ভরাট করার কথা।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা ও কাউয়ারখোপ এলাকার একাধিক টিলা কেটে সেই মাটিই এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু ছৈয়দ বলেন, ‘যেখানে আগে ছোট ছোট পাহাড় ছিল, এখন সেগুলো আর নেই। সেই মাটিই ট্রাকে করে এনে এখানে ফেলা হচ্ছে।’

এদিকে পাহাড় কাটার পাশাপাশি কৃষিজমির উর্বর টপসয়েল অপসারণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এতে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। কৃষক আবদুল হক বলেন, ‘আমাদের জমির ওপরের উর্বর মাটি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এই মাটি গেলে জমি আর আগের মতো ফসল দেবে না। বর্গা চাষের জমি বলে মালিককে কিছু বলতে পারছি না। কিন্তু ক্ষতিটা আমাদের হচ্ছে। ’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, পাহাড় কাটা মানে শুধু মাটি সরানো নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা। তার ভাষায়, ‘এতে বনজ গাছপালা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং প্রাকৃতিক জলধারণ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ষায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ে।’
একই সঙ্গে কৃষিজমির উর্বর স্তর অপসারণ দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুর তুলনায় মাটির দাম কম হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার জানান, দূর থেকে বালু আনতে খরচ বেশি। তাই কাছের পাহাড় কেটে মাটি আনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের মতো ভারী স্থাপনার ক্ষেত্রে মাটির গুণগত মান, ঘনত্ব ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের ভরাট উপকরণ ব্যবহৃত হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় শিক্ষক নুরুল কবির বলেন, ‘এই মাটির ওপর সাবস্টেশন দাঁড়ালে ভিত্তি কতটা শক্ত হবে, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে।’
বাপা রামু উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সায়েদ জুয়েল দাবি করেন, চলতি বছরেই রামুতে সবচেয়ে বেশি পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি অপসারণ হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্পের ঠিকাদার আতাউর রহমান বলেন, ‘সরকারি আইনকানুন মেনেই কাজ করা হচ্ছে।’
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের নজরের বাইরে এমন কার্যক্রম থাকার কথা নয়। প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা ও মাটি পরিবহনের ঘটনা চলতে থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু যদি তা পাহাড় ধ্বংস, কৃষিজমি নষ্ট এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তৈরি করে—তবে সেই উন্নয়নের মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।’