কুমিল্লা: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার অংশ ও আঞ্চলিক সড়কগুলো যেন দিন দিন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। ঈদ পরবর্তী ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলার অভাবে জেলায় বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা।
গত ২৬ দিনে কুমিল্লার বিভিন্ন সড়কে ৩৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৮৫ জন।
কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলার ব্যস্ত সংযোগ সড়কগুলোতে।
সাধারণ মানুষ ও হাইওয়ে পুলিশ বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী দ্রুতগতিতে যানবাহন চালানো, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চালক, নিয়ম অমান্য করে ওভারটেকিং, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মূল চালক বসে থেকে হেলপার দিয়ে গাড়ী চালানো, মাদক সেবন করে গাড়ী চালানো এবং যানবাহনের ফিটনেস সংকট।
সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা নিয়ে আলেখারচর এলাকার ঢাকা থেকে ফেনীগামী যাত্রী আসাদ ও ফয়সালের সঙ্গে। তারা বলেন, বর্তমানে মহাসড়কে যাত্রা করলেই আতঙ্ক কাজ করে। অনেক চালক প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালান, যেন আগে পৌঁছানোই তাদের মূল লক্ষ্য। যাত্রীদের জীবনের মূল্য অনেক সময় বিবেচনায় থাকে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তারা আরও বলেন, মহাসড়কে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি এবং চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ জরুরি। না হলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রী নুসরাত ও আতিক জানান, যাত্রাপথে অনেক সময় বাস চালকদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়, কেউ কেউ আবার সহকারীর সঙ্গে গল্প করতে করতে গাড়ি চালান। এতে যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।
কুমিল্লা প্রেসক্লাবের দফতর সম্পাদক ও জিটিভির কুমিল্লা প্রতিনিধি সেলিম রেজা মুন্সী বলেন, মহাসড়ক অনেক কারণেই এখন বিপজ্জনক। বিশেষ করে সার্ভিস লেন না থাকায় টু হুইলার, থ্রি হুইলার, সিএনজি, অটোরিকশা যত্রতত্র মহাসড়কে উঠে যায়। আর এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটেও বেশি। কিছু ক্ষেত্রে মহাসড়কের পাশে কিছু চালকের বাড়ি থাকায় তারা প্রায় সময় নিজের বাড়ির সামনে এসে গাড়ী চালকের আসনে হেলপার বসিয়ে তারা নেমে যায়। পরের রাস্তাটুকু হেলপার চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ট্রাক ও লরির অনেক চালকই মাদক সেবন করে চালকের আসনে বসে গাড়ী চালায় একারনেও দুর্ঘটনা হয় বেশি। সব কিছু মিলিয়ে গাড়ীর মালিক, চালক, হেলপার, সাধারণ মানুষ ও যাত্রীরা সচেতন ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে এ দুর্ঘটনা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করলেও দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
নিরাপদ চালক চাই-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আজাদ সরকার লিটন বলেন, শুধু চালককে দায়ী করলে হবে না, পুরো পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। চালকের দক্ষতা যাচাই, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং সড়কে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং বাড়াতে হবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা সভাপতি আলহাজ্ব শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অথচ কার্যকর পদক্ষেপ খুব কম দেখা যায়। আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান বাবুল জানান, দুর্ঘটনা কমাতে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা বাড়াতে হবে। অদক্ষ চালকরা যেন কোনোভাবেই সড়কে নামতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিওনের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অতিরিক্ত গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অবৈধ পার্কিং ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চালক ও যাত্রীদের সচেতন করতে প্রচার-প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু পুলিশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। চালক, মালিক, যাত্রী এবং সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।
প্রতিদিনের এই দুর্ঘটনার খবরে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। অনেকেই বলছেন, পরিবার নিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উৎসব মৌসুম বা ছুটির সময় মহাসড়কে ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
সচেতন মহলের দাবি, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে কুমিল্লার সড়কগুলোতে প্রাণহানির মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।