Thursday 16 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আড়াই কোটি টাকা প্রণোদনা
চুয়াডাঙ্গায় ৬৩০০ মেট্রিক টন তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা

রিফাত রহমান ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৬ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৮

চুয়াডাঙ্গায় দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠে এখন বাতাসের সঙ্গে দোল খাচ্ছে সাদা তুলা। ছবি: সংগৃহীত

চুয়াডাঙ্গা: দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠে এখন বাতাসের সঙ্গে দোল খাচ্ছে সাদা তুলা। এই তুলাই এখন চুয়াডাঙ্গার হাজারো চাষির ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। তুলা গাছ ফুল আর পাঁকা-কাঁচা ফলে ভরে গেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলা এখন পরিচিতি পাচ্ছে তুলা চাষের জেলা হিসেবে। লাভজনক এ তুলা দেশের বাজারে চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে হাইব্রিড জাতের চারা উৎপাদন, তুলা চাষে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সাথী ফসলের সঙ্গে তুলা চাষ করে চুয়াডাঙ্গা জেলায় এ চাষ ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে চুয়াডাঙ্গা তুলা উন্নয়ন বোর্ড।

একসময় তুলা চাষে অনীহা থাকলেও বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার চাষিদের কাছে এই চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হাইব্রিড জাতের তুলা বীজ ব্যবহার আর আধুনিক প্রযুক্তির এই চাষ এখন অনেক বেশি লাভজনক। ধান বা পাটের চেয়ে লাভজনক হওয়ায় জেলায় ক্রমেই বাড়ছে সাথী ফসলের সঙ্গে তুলা চাষের পরিধি। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সমান চাষাবাদ এবং ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সরকারি প্রণোদনা চাষিদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

বিজ্ঞাপন

চুয়াডাঙ্গা তুলা উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য মতে, বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে তুলা। বর্তমানে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ করছে চাষীরা। তুলা ৬ থেকে ৭ মাসের ফসল হলেও লাভজনক চাষ। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলা বোর্ড-১২, ১৩ ও ১৪ জাত, রূপালি-১, হোয়াইট গোল্ড-১ ও ২, ডিএম-৪ এবং শুভ্র-৩ জাতের তুলা চাষ হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চুয়াডাঙ্গা জেলার ১১টি ইউনিটের আওতায় ২ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়েছে। এই ইউনিটগুলোতে ৬ হাজার ৫০০ জন চাষি তাদের জমিতে তুলা চাষ করেছে। এবার ৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন তুলা উৎপাদন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এ মৌসুমে তুলা উন্নয়ন বোর্ড ৩ হাজার ৫০ জন তুলা চাষিকে ৩ হাজার ৫০ বিঘা জমিতে তুলা চাষের জন্য ৮ হাজার টাকা মূল্যের ভর্তুকিতে হাইব্রিড তুলা বীজ, সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও পিজিআর সহায়তা দিয়েছে। যার মূল্য ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

দোআঁশ ও পলিযুক্ত মাটি এবং উচুঁ জমি তুলা চাষের জন্য উপযোগী। বৈরী আবহাওয়া ঠেকাতে বীজ তলায় বীজ বপণের ১০-১২ দিন পর মূল জমিতে চারা রোপণ করতে চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি মৌসুমে ১৫ থেকে ৩০ জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে চাষিরা জমিতে তুলা গাছের চারা রোপণ করে। তুলার জমিতে জৈব সারের ব্যবহার বেশি। শুধু পোকা-মাকড় দমণের জন্য কীটনাশক ব্যবহার হয়। তুলা চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে যে চাষি শ্রমিক না নিয়ে নিজেই জমিতে কাজ করে তার খরচ তুলনা মূলক কম হয়।

জানা গেছে, বিঘায় ১৪ থেকে ১৭ মণ তুলা পাওয়া যায়। খরচ বাদে প্রতিবিঘায় লাভ থাকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতিমণ তুলার বর্তমান বাজার দর ৩ হাজার ৮৪০ টাকা। দেশে উৎপাদিত ধবধবে সাদা রঙ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় এ তুলার বেশ চাহিদা রয়েছে। এ বছর ২ হাজার ১০০ হেক্টর জমি থেকে চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন তুলা ও বীজ উৎপাদন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। যার বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

মাঠ পর্যায়ে গেলে দেখা যায় সাফল্যের নানা চিত্র। জেলার দামুড়হুদা ইউনিটের চিৎলা ব্লকের চাষী আবুল কালাম, জসিম উদ্দীন এবং নূর আলমের মতো চাষিরা এখন আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড তুলা চাষ করছে। তাদের মতে, সরকারি সহায়তায় উন্নত মানের বীজ ও সার পাওয়ায় তুলা চাষ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ ও লাভজনক।

চুয়াডাঙ্গার প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা সেন দেবাশীষ সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত দু’বছর ধরে আমরা কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে আসছি। তুলা চাষে প্রণোদনা দেওয়ার কারণে কৃষকদের উৎসাহ ও আগ্রহ বেড়ে গেছে। এবার তুলার ফলনও ভালো হয়েছে। এবার কৃষকরা প্রতি বিঘায় ১৪ থেকে ১৭ মণ তুলা উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমরা তুলা চাষে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। দামুড়হুদায় পেঁপের জমিতে তুলা চাষ হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তুলা চাষের জন্য জমিতে কৃষকদের সার দেয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। জমিতে সার দিলেই যে ফলন ভালো হয় না, সেটা আমরা পরীক্ষা করে তাদের দেখাচ্ছি। এই পরীক্ষার ফলে কৃষকরা অতিরিক্ত সার ব্যবহার থেকে সরে আসছে। ফলে সারের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে। এতে ফলন বেড়ে যাবে। ফলে কৃষক অধিক লাভবান হবে ও তুলা চাষে আগ্রহ বাড়বে। আমরা শুধু সার-বীজ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছি না। কটন ইউনিট অফিসাররা নিয়মিতভাবে প্রান্তিক চাষিদের কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে।’

যশোর তুলা উন্নয়ন বোর্ডর উপ-পরিচালক ড. তাসদিকুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার মাটি তুলা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ জেলার চাষিরা সঠিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। একসময় জমিতে ৬০ সেন্টিমিটার দূরুত্বে তুলা গাছ রোপণ করা হতো, একটা সারি থেকে আরেকটি সারির দুরত্ব ছিল ৯০ সেন্টিমিটার। বর্তমানে এক সারি থেকে আরেক সারির দূরত্ব করা হয়েছে ৩০ সেন্টিমিটারে। কীভাবে বিঘা, একর ও হেক্টর প্রতি তুলা গাছ রোপণের সংখ্যা বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে আমাদের গবেষণা চলছে।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে হেক্টরপ্রতি ৩০ হাজারের বেশি তুলা গাছ রোপন করা যায় না। কিন্তু উন্নত দেশগুলো হেক্টরপ্রতি ২ লাখ ৭০ হাজার তুলা গাছ রোপণ করে থাকে। তুলা গাছের রোপণ যদি বাড়ানো যায় তাহলে চাষিরা উৎপাদন বাড়িয়ে অধিক লাভবান হবে। দিনে দিনে আমরা উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে চাষিদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। গত অর্থবছরে ১৫ হাজার ৯০০ জন চাষি প্রণোদনা পেয়েছিলেন। চলতি অর্থবছরে সেটা ১৭ হাজার ৯০০ জনে দাঁড়িয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গার তুলা চাষ শুধু চাষিদের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না, বরং দেশের টেক্সটাইল শিল্পেও যোগ করছে নতুন মাত্রা। ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার এই সরকারি বিনিয়োগ যদি সঠিক সময়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়, তবে আগামীতে এ জেলায় তুলা চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা চাষিদের।

বিজ্ঞাপন

চাকরি দেবে অ্যাকশনএইড
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৫

বায়ুদূষণে ঢাকা বিশ্বে ষষ্ঠ
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪০

আরো

রিফাত রহমান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর