Saturday 04 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মানসিক চাপ নাকি অবিচার? নওশিনের মৃত্যুতে উঠছে গুরুতর অভিযোগ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০১

শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিন।

কুমিল্লা: চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন নিয়েই খুলনা ছেড়েছিলেন অর্পিতা নওশিন। সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে একদিন রোগীর পাশে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাই ছিল তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই নিভে গেল এক সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণ।

কুমিল্লার একটি বেসরকারি (কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ) মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের মৃত্যু এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একাধিকবার একই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া, মানসিক চাপ ও শিক্ষকের আচরণ নিয়ে সহপাঠীদের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

জানা গেছে, কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস (২০২১-২২) সেশনের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনকে একটি বিষয়ে পাঁচবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রতিবারই উত্তীর্ণ হওয়ার মতো নম্বর পাননি তিনি।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) আবারও ফরম ফিলআপের জন্য বাড়ি থেকে টাকা নেন। কিন্তু পরদিন শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় হোস্টেলের নিজ কক্ষ থেকে অসুস্থ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সহপাঠীরা। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সহপাঠীদের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে নওশিন বিপুল পরিমাণ ওষুধ সেবন করেছিলেন।

অর্পিতা নওশিনের বাড়ি খুলনা সদরে। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। খুলনার সরকারি করোনেশন গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেলে ভর্তি হন।

নওশিনের সহপাঠীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, প্রথম বর্ষ থেকেই এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মুনিরা জহিরের সঙ্গে তার সমস্যা শুরু হয়। প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় অন্যান্য সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও এনাটমিতে অকৃতকার্য হন তিনি। এরপর গত তিন বছরে বারবার পরীক্ষা দিলেও একই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

তাদের দাবি, প্রথম বর্ষেই প্রকাশ্যে তাকে ফেল করানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। একই ব্যাচের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বর্তমানে পঞ্চম বর্ষে পড়াশোনা করলেও নওশিন প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষাতেই আটকে ছিলেন।

নওশিনের বড় ভাই শাহরিয়ার আরমান বলেন, ‘আমার বোন আত্মহত্যা করার মতো মানসিকতার মানুষ ছিল না। কলেজের চাপ ও মানসিক নির্যাতনই তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে। সে বারবার একটি নির্দিষ্ট শিক্ষকের কথা বলত।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি বিষয়ে পাস করলেও একটি বিষয়ে বারবার ফেল করানো হয়েছে। আমরা জানতে চেয়েছি সমস্যাটা কোথায়, কিন্তু কলেজ কর্তপক্ষের কোনো উত্তর পাইনি। আমার বোনের সঙ্গে যা হয়েছে, এটা নিছক আত্মহত্যা নয়—এর পেছনে দায়ীদের খুঁজে বের করতে হবে।’

ঘটনার আগের দিনও বোনের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘ফরম ফিলআপের জন্য টাকা চেয়েছিল। আমি আশ্বস্ত করেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরদিনই এমন খবর পাব, কখনো ভাবিনি।’

এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক লিটন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান ডা. মুনিরা জহির এর মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কেউ ই মোবাইল রিসিভ করেনি।

এ বিষয়ে সদর দক্ষিণ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন তাই এ বিষয় নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাচ্ছিনা।’

ঘটনাটি নিয়ে সহপাঠী ও পরিবারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে। একটি স্বপ্নভঙ্গের এই মর্মান্তিক পরিণতি এখন শিক্ষাঙ্গনে মানসিক চাপ ও শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর