Saturday 07 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আলুর দামে ধস, লোকসানে রংপুরের কৃষকরা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ মার্চ ২০২৬ ১৮:০৭

খেত থেকে তোলা হেচ্ছ আলু।

রংপুর: ভরা মৌসুমের শুরুতেই আলুর দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পাইকারি বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০-১২ টাকায়, কোথাও কোথাও খুচরা বাজারে ৮-৯ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ পড়েছে কেজিতে ১৪-২২ টাকা। ফলে কেজিপ্রতি ২-১০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছেন কৃষকরা। গত বছরের অবিক্রিত আলু বাজারে থেকে যাওয়া, দুর্বল বাজারব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রংপুর সিটি বাজারসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। নতুন আলুর সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় কৃষকেরা উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এতে ঈদের আগে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। তবে সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় মোট উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। ফলে মৌসুমের শুরুতেই অনেক কৃষক কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন।

এদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগ ও রংপুর বিভাগ মিলিয়েই উৎপাদন প্রায় ৮৭ লাখ টন। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে এ দুই বিভাগে মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৪ লাখ টন। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদর কমে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় একরপ্রতি উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকার বেশি।

গঙ্গাচড়া উপজেলার কৃষক সুজন রহমান বলেন, গত মৌসুমেও তার লোকসান হয়েছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার আবার আলু চাষ করেছিলেন। কিন্তু তার এখন উৎপাদন খরচই উঠছে না। তার ভাষায়, ‘এভাবে চললে পথে বসতে হবে।’

কাউনিয়া উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ভরা মৌসুম শুরু হতে এখনও প্রায় এক মাস বাকি। আগাম আলু চাষ করে বেশি দামের আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু গত বছরের পুরনো আলু বাজারে থাকায় নতুন আলুর চাহিদা কমে গেছে।

তারাগঞ্জ উপজেলার প্রামাণিকপাড়া গ্রামের কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, এক কেজি আলু বিক্রি করে এক কাপ চায়ের দামও ওঠে না। গত বছর দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এবারও একই পরিস্থিতি হলে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে।’

এই উপজেলায় গত বছর ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন। কিন্তু তিনটি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১৬ হাজার টন হওয়ায় অধিকাংশ আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। অনেক কৃষক বাড়িতে রেখে আলু নষ্ট হওয়ার শিকার হয়েছেন। চলতি মৌসুমে আবাদ কমে ৩ হাজার ৪৬৩ হেক্টরে নেমে এলেও বাজারদর না পাওয়ায় একই সংকটে পড়েছেন তারা।

বামনদীঘি গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া জানান, জমি ইজারা, চাষ, বীজ, সার, ওষুধ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে একরপ্রতি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কেজি। সে হিসাবে প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে ১৬ টাকার বেশি। অথচ বাজারে দাম তার অর্ধেক।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু এবং হিমাগারের সক্ষমতা বাড়ানো না হলে প্রতি বছরই এমন লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানি রায় বলেন, বাজার পরিস্থিতি ও সংরক্ষণ সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (রংপুর অঞ্চল) উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান জানান, কৃষকদের দেশি পদ্ধতিতে মাচা করে আলু সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তবে কৃষকরা জানান, গত বছরের লোকসানের ঋণ এখনও অনেকের কাঁধে। নতুন করে লোকসান হলে তাদের পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর