চোখের উপর প্লাস্টিকের একটি হেডসেট পরে ড্রয়িংরুমে বসে থাকার অনুভূতি কি কখনও বালির সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউ কিংবা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে থাকার রোমাঞ্চকে ছুঁতে পারে? প্রথম দর্শনে ধারণাটি কিছুটা অদ্ভুত বা কাল্পনিক মনে হতেই পারে। কিন্তু বর্তমানের ভার্চুয়াল ট্যুরিজ়ম আর পুরোনো যুগের আবছা ৩৬০-ডিগ্রি ভিডিয়োর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজকের হাই-ডেফিনিশেন থ্রিডি (3D) VR প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনি সোফায় বসেই মিশরের পিরামিডের ভিতরে হাঁটতে পারেন, টোকিও-র জনবহুল রাস্তায় হারিয়ে যেতে পারেন কিংবা চোখের নিমেষে চলে যেতে পারেন আমাজনের গহীন অরণ্যে।
কেন বাড়ছে ভার্চুয়াল ট্রাভেলের জনপ্রিয়তা?
বাস্তব দুনিয়ার ভ্রমণ দিন দিন জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। সেই কারণেই ভার্চুয়াল ট্যুরিজ়মের জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বাড়ছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞরা।
অর্থ ও সময়ের সাশ্রয়: আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম এবং বিলাসবহুল হোটেলের খরচ বাঁচিয়ে একটি হেডসেটের মাধ্যমেই পুরো পৃথিবী ঘুরে ফেলা সম্ভব।
পরিবেশ সচেতনতা ও ‘কার্বন গিল্ট’ থেকে মুক্তি: বিশ্ব জুড়ে কার্বন নিঃসরণের (Carbon Footprint) জন্য বিমান চলাচল অনেকাংশে grocery দায়ী। পরিবেশ সচেতন বহু পর্যটক এখন বিমানে দূরপাল্লার ভ্রমণের ‘পরিবেশগত অপরাধবোধ’ থেকে বাঁচতে এই ডিজিটাল দুনিয়াকে বেছে নিচ্ছেন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয়: প্রবীণ নাগরিক, বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষ কিংবা চরম আর্থিক অনটনে থাকা মানুষ, যাঁরা হয়তো কোনওদিনই বাস্তবে আন্টার্কটিকা বা মাচু পিচু যাওয়ার সুযোগ পাবেন না, এই প্রযুক্তি তাঁদের সামনে এনে দিচ্ছে এক অন্তহীন দরজা।
পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের স্বাদ কি ডিজিটালাইজ়ড করা সম্ভব?
প্রযুক্তির এত রমরমা সত্ত্বেও একটা জায়গায় এসে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি থমকে যেতে বাধ্য। কারণ, আসল ভ্রমণের আনন্দ কেবল কোনও জায়গা চোখের সামনে ‘দেখা’ নয়। আসল ভ্রমণ মানেই এক চরম অনিশ্চয়তা ও রোমাঞ্চ। ব্যাঙ্ককের স্ট্রিট ফুডের সেই চেনা গন্ধ, রোমের রাস্তায় মাইলের পর মাইল হাঁটটার পর পায়ের ক্লান্তি, অচেনা কোনও ক্যাফেতে কোনও বিদেশি সহযাত্রীর সঙ্গে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আড্ডা দেওয়া কিংবা চেনা রুটিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাওয়া, এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি ও মানবিক সংযোগকে কোনও কোডিং বা গ্রাফিক্স প্রসেসর দিয়ে আজ পর্যন্ত হুবহু নকল করা সম্ভব হয়নি।
তা ছাড়া, ভার্চুয়াল ট্যুরিজ়মও কিন্তু পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব নয়। এই কোটি কোটি থ্রিডি ডেটা প্রসেস করতে এবং ক্লাউড কম্পিউটিং সচল রাখতে বিশ্ব জুড়ে যে বিশাল ডেটা সেন্টারগুলো চব্বিশ ঘণ্টা চলে, তাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয় এবং পরোক্ষ ভাবে তা পরিবেশের ক্ষতিই করে।
ভবিষ্যতের হাইব্রিড মডেল
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি হয়তো আসল ভ্রমণকে চিরতরে মুছে দেবে না, কিন্তু ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির খোলনলচে বদলে দেবে। কারণ, অদূর ভবিষ্যতে আসতে চলেছে ‘হাইব্রিড’ টুরিজ়ম (Hybrid Tourism)। ভ্রমণকারীরা এখন টিকিট বুক করার আগেই VR-এর মাধ্যমে সেই জায়গাটি একবার ‘প্রিভিউ’ করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তাছাড়া অতি সংবেদনশীল বা ভঙ্গুর ঐতিহাসিক স্থান যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেখানে ভার্চুয়াল অ্যাক্সেস দেওয়া সম্ভব হবে। সুতরাং, ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ আর বাইরের জগৎ দেখার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকে এই প্রযুক্তি এক নতুন মাত্রা দিতে চলেছে।