শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের অবসর যেন ডুমুরের ফুল। ইট-কাচের খাঁচায় একটু সবুজের ছোঁয়া পেতে ইনডোর প্লান্ট লাগালেও, সময়ের অভাবে অনেকেই তার যত্ন নিতে পারেন না। নিয়মিত মাটি বদলানো, ককোপিট দেওয়া বা পানি ঢালার ঝামেলার কারণে অনেকেরই বাগান করার শখ অধরা থেকে যায়। কিন্তু কেমন হতো, যদি এমন কোনো গাছ থাকতো যার জন্য এক ফোঁটা মাটিরও প্রয়োজন নেই? হ্যাঁ, কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনালেও এটাই সত্যি! শুধু পর্যাপ্ত আলো আর বাতাস পেলেই চমৎকারভাবে বেড়ে ওঠে এক আশ্চর্য উদ্ভিদ, যার নাম ‘এয়ার প্লান্ট’ (Air Plant)।
এয়ার প্লান্ট আসলে কী?
এয়ার প্লান্টের নাম শুনেই বোঝা যায়, বাতাসের সাথে এর গভীর মিতালী। ‘ব্রোমোলিয়াসি’ পরিবারের অন্তর্গত এই চিরহরিৎ, বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদগুলোর বেড়ে ওঠার জন্য কোনো মিডিয়ার (মাটি বা ককোপিট) প্রয়োজন হয় না। এদের পাতায় ‘ট্রাইকোম’ নামের বিশেষ কোষ থাকে, যা বাতাস থেকে সরাসরি পানি ও পুষ্টি উপাদান শুষে নেয়।
আমাজন, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো ট্রপিকাল রেইনফরেস্ট থেকে শুরু করে মেক্সিকোর মরু অঞ্চলেও এদের দেখা মেলে। আমাদের দেশে যেসব এয়ার প্লান্ট পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা।
ঘরের কোথায় রাখবেন?
আপনার বারান্দা, লিভিং রুমের জানালার পাশে কিংবা শোবার ঘরের যে অংশে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে, সেখানেই ঝুলিয়ে বা সাজিয়ে রাখতে পারেন এয়ার প্লান্ট। এটি ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি আপনার রুচিশীল মানসিকতারও পরিচয় দেবে। তবে ভুলেও এদের বদ্ধ কাঁচের পাত্র বা টেরোরিয়ামে রাখবেন না, কারণ এদের বেঁচে থাকার প্রধান ওষুধই হলো মুক্ত বাতাস।
যত্ন নেওয়ার সহজ ‘ম্যাজিক ট্রিকস’
মাটি না লাগলেও এই উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য সঠিক তাপমাত্রা ও পানির প্রয়োজন। জেনে নিন এর সহজ কিছু পরিচর্যা…
আলো ও তাপমাত্রা: এয়ার প্লান্ট পরোক্ষ বা ফিল্টারড সূর্যালোক পছন্দ করে। সরাসরি কড়া রোদে রাখলে পাতার কিনারা পুড়ে বাদামী হয়ে যায়। সাধারণত ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা এরা সহ্য করতে পারে না।
পানি দেওয়ার নিয়ম: গরমের দিনে ৭ দিন এবং শীতকালে ১৫ দিন পর পর পরিষ্কার বালতির পানিতে পুরো গাছটিকে ৩০ মিনিটের জন্য ডুবিয়ে রাখুন।
পানি ঝরানোর বিশেষ কৌশল: পানি থেকে তোলার পর গাছটিকে অবশ্যই উল্টো করে পত্রিকা বা প্লাস্টিকের বোলের ওপর রাখুন। পাতার গোড়ায় পানি জমে থাকলে মাত্র ২ দিনেই সাধের গাছটি পচে যেতে পারে!
পানির ধরণ: ক্লোরিনযুক্ত সাপ্লাইয়ের পানি এদের জন্য বিষ। তাই ডিপ টিউবওয়েল বা ফিল্টারের পানি ব্যবহার করুন। ঘরে অ্যাকুরিয়াম থাকলে তার নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ পানি স্প্রে করতে পারেন, যা গাছের জন্য দারুণ উপকারী।
আমাদের দেশের আবহাওয়ার উপযোগী ৫টি জাত
বর্তমানে উদ্ভিদপ্রেমীদের মাঝে এয়ার প্লান্টের এই ৫টি ভ্যারাইটি দারুণ জনপ্রিয়…
তিলান্দসিয়া আয়নান্থ (Tillandsia Ionantha)
নতুনদের জন্য এই জাতটি একদম পারফেক্ট। এর হলুদ পুংকেশর আর বেগুনি-নীল ফুল দেখতে চমৎকার। ফুল আসার সময় এর পাতাগুলো লাল রঙ ধারণ করে। এর যত্ন নেওয়া সবচেয়ে সহজ।
আয়নান্থ ফুইগো (Ionantha Fuego)
মেক্সিকোর আদি নিবাসী এই গাছটি খুব দ্রুত বাড়ে এবং চারপাশ ছড়িয়ে গোলাকার রূপ নেয়। এর পাতার উপরিভাগ উজ্জ্বল লাল রঙের হয়। বাঁশ, পাথর বা তারের সাথে ঝুলিয়ে রাখলে এটি ঘরের আবহ বদলে দেয়।
ফ্রান্কিয়ানা (Frankiana)
দেখতে ঠিক কাঠবিড়ালির ঝোপালো লেজের মতো! এতে কমলা ও হলুদ রঙের ফুল ফোটে, যা প্রায় ৭ দিন স্থায়ী হয়। ফুল ফোটার পর মাতৃগাছটি কিছুটা হলুদ হয়ে গেলেও ভয়ের কিছু নেই, এর গোড়া থেকেই আবার নতুন কুশি জন্মায়।
তিলান্দসিয়া ক্যাপট— মেডুসে (Tillandsia Caput-Medusae)
গ্রীক পুরাণের সাপের চুলওয়ালা দেবী ‘মেডুসা’র নামানুসারে এর নামকরণ। এর পাতালোগুলো কোঁকড়ানো আর আঁকাবাঁকা। তবে মনে রাখবেন, এর নিচের অংশটি বৈদ্যুতিক বাল্ব বা পেঁয়াজের মতো হওয়ায় একে পানিতে ডুবিয়ে ভিজানো যাবে না। গোড়ায় পানি জমলে এটি পচে যায়।
তিলান্দসিয়া জেরোগ্রাফিকা (Tillandsia Xerographica)
এটি মূলত মরু অঞ্চলের এয়ার প্লান্ট। আকারে প্রায় ১ ফুট পর্যন্ত বড় ও গোল হয়। এর পানির চাহিদা নেই বললেই চলে, তাই পানিতে ডুবানোরও প্রয়োজন হয় না। প্রচণ্ড গরম সহ্য করতে পারা এই গাছের ঠিক মাঝখান থেকে লাঠির মতো ফুল বের হয়, যা লাল, কমলা ও হলুদের মিশ্রণে অপূর্ব দেখায়।
উল্লেখ্য, কোনো টব বা মাটির ঝামেলা না থাকায় এয়ার প্লান্টকে আপনি নিজের মনের মতো করে ঘরের যেকোনো জায়গায় ফ্রেমে, কাঠে বা তারে ঝুলিয়ে সাজাতে পারেন। কম পরিশ্রমে ঘরের ভেতরে এক টুকরো মায়াবী সবুজ পেতে চাইলে আজই আপনার পছন্দের তালিকায় যুক্ত করুন ট্রেন্ডি ‘এয়ার প্লান্ট’!