মেদ কমানোর কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠোর ডায়েট চার্ট, কার্বোহাইড্রেট বর্জন আর জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানোর চেনা দৃশ্য। অনেকেই মনে করেন, ফিট থাকতে হলে শরীরকে কঠিন কোনো রুটিনে বেঁধে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। তবে সুস্থ জীবনযাপনের আধুনিক দুনিয়ায় এখন এক নতুন ধারণার জোয়ার এসেছে। কোনো রকম বাড়তি কায়িক পরিশ্রম ছাড়াই, কেবল সচেতনভাবে সঠিক নিয়মে শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস বা ‘ব্রিদিং এক্সারসাইজ’ করেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে শরীরের ওজন। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটি এখন বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয় এক লাইফস্টাইল ট্রেন্ড।
আসুন জেনে নেই, জিম-ডায়েটের বাইরে গিয়ে এই শ্বাসের ব্যায়াম কীভাবে আমাদের ফিট রাখতে সাহায্য করে…
শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে ওজনের কানেকশন কোথায়?
অনেকেরই ধারণা, চর্বি কমানোর একমাত্র উপায় হলো কড়া ডায়েট। তবে বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। শরীরের জমে থাকা চর্বি যখন ভেঙে যায়, তার একটি বড় অংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড হিসেবে আমাদের ফুসফুস হয়ে নিঃশ্বাসের সাথেই শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে শুধু অলস বসে শ্বাস নিলেই ওজন কমবে। তবে এটি শরীরের ভেতর এমন কিছু হরমোনাল ও শারীরিক পরিবর্তন আনে, যা মেদ কমানোর পুরো প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি গতিশীল করে তোলে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে ব্রিদিং এক্সারসাইজের ৩টি বড় ভূমিকা
স্ট্রেস হরমোন নিয়ন্ত্রণ: মানসিক চাপের কারণে শরীরে ‘কর্টিসল’ নামের হরমোন বাড়ে, যা পেটে চর্বি জমায় এবং হুটহাট খাওয়ার লোভ বাড়িয়ে দেয়। শ্বাসের ব্যায়াম এই হরমোনের নিঃসরণ কমায়।
অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি: গভীর শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রচুর অক্সিজেন প্রবেশ করে। এতে কোষগুলো সতেজ হয় এবং হজমপ্রক্রিয়া উন্নত হয়।
আবেগতাড়িত খাওয়ার অভ্যাস দূর: মন শান্ত থাকলে হুটহাট জাঙ্ক ফুড বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা (Emotional Eating) অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।
সহজে করার মতো ৪টি কার্যকরী ব্রিদিং এক্সারসাইজ
সহজেই ঘরে বসে আপনি এই ৪টি শ্বাসের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করতে পারেন…
১. ডায়াফ্র্যাগম্যাটিক ব্রিদিং (পেটের সাহায্যে শ্বাস)
আরাম করে বসে বা শুয়ে নাক দিয়ে এমনভাবে গভীর শ্বাস নিন যেন বুকের বদলে আপনার পেট ফুলে ওঠে। কয়েক সেকেন্ড বাতাস ধরে রেখে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এটি শরীরকে নিমেষেই শিথিল করে।
২. বক্স ব্রিদিং (চার ধাপের ম্যাজিক)
প্রথমে ৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড শ্বাসটি ভেতরে আটকে রাখুন, এরপর ৪ সেকেন্ড সময় নিয়ে শ্বাস ছাড়ুন এবং সবশেষে ৪ সেকেন্ড ফুসফুস খালি রাখুন। তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে এটি দারুণ কাজ করে।
৩. কপালভাতি (যোগব্যায়াম)
এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে হয়, কিন্তু পেট ভেতরের দিকে সংকুচিত করে জোরের সাথে দ্রুত নিঃশ্বাস ছাড়তে হয়। এটি হজমশক্তি ও পেটের মেদ কমাতে দারুণ কার্যকর। (তবে উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা থাকলে এটি এড়িয়ে চলুন)।
৪. অনুলোম-বিলোম (নাড়ি শোধন)
ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ডান নাসারন্ধ্র বন্ধ করে বাম পাশ দিয়ে গভীর শ্বাস নিন। এবার বাম পাশ বন্ধ করে ডান পাশ দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। একইভাবে উল্টো প্রক্রিয়াটি করুন। এটি মানসিক স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ঝটপট ১৫ মিনিটে প্রতিদিনের রুটিন
সকালে খালি পেটে কিংবা যেকোনো ভারী খাবার খাওয়ার অন্তত ২ ঘণ্টা পর এই রুটিনটি পয়েন্ট আকারে মেনে চলতে পারেন…
ডায়াফ্র্যাগম্যাটিক ব্রিদিং: প্রতিদিন সকালে শান্ত হয়ে বসে ৩ মিনিট এই চর্চা করুন।
বক্স ব্রিদিং: মনকে স্থির করতে এরপরের ৩ মিনিট বক্স ব্রিদিং করুন।
কপালভাতি: পেটের মেদ কমাতে ও মেটাবলিজম বাড়াতে ৩ থেকে ৫ মিনিট কপালভাতি করুন।
অনুলোম-বিলোম: সবশেষে শরীর ও মস্তিষ্ককে শান্ত করতে ২ থেকে ৩ মিনিট অনুলোম-বিলোম করুন।
পরামর্শ: শুধু শ্বাসের ব্যায়াম করলেই রাতারাতি ম্যাজিকের মতো ওজন কমবে না। এর পাশাপাশি সুষম খাবার ও সক্রিয় লাইফস্টাইল জরুরি। তবে জিম আর ডায়েটের পাশাপাশি এই সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস আপনার মেদ কমানোর জার্নিকে দ্বিগুণ সহজ ও ক্লান্তিহীন করে তুলবে।