অফিসের টেবিলে ফাইলের পাহাড়। বসের গম্ভীর মুখ। আর কাজের চাপে দিশেহারা। ঠিক এমন এক দমবন্ধ করা মুহূর্তে হঠাৎ যদি আপনার সহকর্মী পেছনের চেয়ার থেকে ঘুরে আপনার দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে পুরো জিহ্বাটা বের করে এক অদ্ভুত ভেংচি কেটে বসে, তবে কেমন হবে? রেগে আগুন হয়ে যাবেন, নাকি সব ক্লান্তি ভুলে হোহো করে হেসে উঠবেন? যদি হাসেন, তবে বুঝে নেবেন আপনি অজান্তেই মেতে উঠেছেন বিশ্বজুড়ে উদযাপিত এক অদ্ভুত ও আনন্দময় উৎসবে!
আজ ১৯ জুলাই, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি দারুণ এক উৎসব ‘জিহ্বা বের করার মজার দিবস – Stick Out Your Tongue Day। যান্ত্রিক জীবনের সব গাম্ভীর্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটুখানি মন খুলে হাসা আর শৈশবের সেই নিষ্াপাপ দুষ্টুমিতে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ এনে দেয় এই বিশেষ দিনটি।
ভেংচি কাটার আদি ইতিহাস ও বিশ্ব সংস্কৃতি
ছোটবেলায় খেলার মাঠে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় কাউকে খেপানোর সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় উপায় ছিল জিহ্বা বের করে ভেংচি কাটা। তবে এই আচরণের ইতিহাস কিন্তু কেবল ছোটদের দুষ্টুমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তিব্বতের ঐতিহ্যবাহী অভিবাদন: আমাদের দেশে কাউকে জিহ্বা দেখালে যেখানে মানুষ রেগে যায়, তিব্বতে কিন্তু এটি সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সম্মান প্রদর্শনের জন্য একে অপরকে জিহ্বা বের করে স্বাগত জানানো হয়। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করে যে তাদের মনে কোনো কালো বা খারাপ উদ্দেশ্য নেই।
নিউজিল্যান্ডের মাওরি যোদ্ধাদের বীরত্ব: নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী মাওরি যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘হাকা’ (Haka) নৃত্যের সময় চোখ বড় বড় করে এবং পুরো জিহ্বা বের করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করত, যা আজও খেলাধুলার মাঠে দেখা যায়।
মেজাজ ফুরফুরে করার এক জাদুকরী মজা
ব্যস্ত ও যান্ত্রিক নাগরিক জীবনে মানুষ যখন হাসতেই ভুলে যাচ্ছে, তখন এই দিনটির প্রাসঙ্গিকতা যেন আরও বেড়ে যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের একঘেয়েমি আর মানসিক চাপ (Stress) দূর করার জন্য এই দিনটি এক দারুণ জাদুকরী দাওয়াই হিসেবে কাজ করে।
নিজের ভেতরের আমিত্ব বা অহংকারকে একপাশে সরিয়ে রেখে একটু বোকা সাজা কিংবা ফানি ফেস (Funny Face) তৈরি করে সহকর্মীদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার নামই হলো এই দিবস। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাঝে মাঝে সামাজিক নিয়মের খোলস ভেঙে একটুখানি শিশুসুলভ আচরণ করা মনের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী।
একটি মজার বৈজ্ঞানিক তথ্য: কেবল মনের আনন্দই নয়, ইয়োগা বা যোগব্যায়ামে জিহ্বা পুরোটা বের করে শ্বাস ছাড়ার একটি বিশেষ আসন রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘সিংহাসন’ (Lion Pose)। এই আসনটি মুখের পেশির রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে, থাইরয়েডের সমস্যা দূর করতে এবং চেহারার তারুণ্য ধরে রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা
মজা আর হাসাহাসির পাশাপাশি এই দিবসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতামূলক দিকও রয়েছে। চিকিৎসকেরা এই দিনে সবাইকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত একবার নিজের জিহ্বাটি ভালো করে পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
আমাদের জিহ্বার রঙ ও গঠন কিন্তু শরীরের ভেতরের অনেক রোগের আগাম বার্তা দেয়। যেমন: জিহ্বায় অতিরিক্ত সাদা আস্তরণ থাকলে বুঝতে হবে শরীরে টক্সিন বা হজমের সমস্যা রয়েছে। আবার অতিরিক্ত লাল বা কালচে ভাব রক্তাল্পতা কিংবা ভিটামিনের অভাব নির্দেশ করে। তাই ভেংচি কাটার ছলে আজই একবার দেখে নিন আপনার শরীরের আয়না ঠিক আছে কিনা!
যেভাবে মেতে উঠবেন ১৯ জুলাইয়ের এই আনন্দে
এই অদ্ভুত দিনটি উদযাপন করা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজগুলোর একটি। এর জন্য কোনো বাড়তি টাকা বা প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটি মজাদার ফানি ফেস তৈরি করে জিহ্বা বের করে সেলফি তুলুন এবং বন্ধুদের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন। কাজের ফাঁকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সহকর্মীদের সাথে এই মজার আচরণটি করে কাজের পরিবেশকে হালকা ও আনন্দময় করে তুলুন। আজ ১৯ জুলাই বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ট্রেন্ডিং তালিকার শীর্ষে রয়েছে #StickOutYourTongueDay হ্যাশট্যাগটি। আপনিও এই ভার্চুয়াল উৎসবে শামিল হতে পারেন।
দিনশেষে ল্যাপটপটা বন্ধ করে যখন বাড়ির দিকে পা বাড়াবেন, তখন গাড়ির জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে একবার আলতো করে জিহ্বাটা বের করেই দেখুন না! চারপাশের চেনা পৃথিবীটাকে হঠাৎ করেই কতখানি সহজ আর সুন্দর মনে হবে। ঠোঁটের কোণে জমা হওয়া সেই এক চিলতে অমলিন হাসি যেন ফিসফিস করে বলে যাবে “জীবনটা তো একটাই, একে এত গম্ভীর করে রাখার কী দরকার? মাঝে মাঝে একটুখানি বোকা সেজে বেঁচে থাকার আনন্দটাই আলাদা!”